কমরেড তাজুল স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ বেদিতে পার্টি নেতৃবৃন্দের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের মহান শহীদ কমরেড তাজুল ইসলামের ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১ মার্চ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ বেদিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে সিপিবি’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, স্বৈরাচারকে সাথে নিয়ে গণতন্ত্র হয় না। গণতন্ত্র বিসর্জন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন হয় না। ’৭১-এ হত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগের হুকুম দেওয়ার জন্য যেমন গোলাম আযমকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে, তেমনিভাবে তাজুলসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অনেক সংগঠক খুনের হুকুমদাতা হিসেবে স্বৈরাচার এরশাদকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
কমরেড সেলিম আরো বলেন, বর্তমান সংকট রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। তার জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। আন্দোলন করার অধিকার থাকলেও, আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যা ও জ্বালাও-পোড়াও এর অধিকার কারও নেই। জ্বালাও-পোড়াও, সহিংস রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ক্রমসফায়ার, গুম-খুন, বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড বন্ধ করতে হবে। জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। তিনি অভিজিৎ রায়ের হত্যাকারীদের এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন।
কমরেড সেলিম আরো বলেন, তাজুল মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও হরতাল সফল করার জন্য আদমজীতে মিছিল সংগঠিত করেছিলেন। তাজুলের মৃত্যু বীরের মৃত্যু। তাজুলের আত্মদানের পথ ধরেই শ্রমিকশ্রেণির পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি এবং বিপ্লবী ধারার ট্রেড ইউনিয়নকে শক্তিশালী করতে হবে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রুহুল আমিন ও আবদুল্লাহ আল কাফি রতন। কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল গাওয়ার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়। শ্রদ্ধা নিবেদনকালে উপস্থিত ছিলেন সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ, কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খান, সহিদুল্লাহ চৌধুরী, প্রেসিডিয়াম সদস্য হায়দার আকবর খান রনো, ড. কামাল হোসেন, পঙ্কজ ভট্টাচার্য, খালেকুজ্জামান, বিমল বিশ্বাস, মোস্তফা মহসিন মণ্টু, শিরিন আক্তার, শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, সাইফুল হক, আব্দুস সাত্তার, ডা. শাহাদাৎ হোসেন, ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, ইসমাইল হোসেন, শহীদ তাজুলের পরিবারের পক্ষে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র তৌফিকুল ইসলাম টিবলু ও পুত্রবধু তানজিম রহমান প্রমুখ।
শহীদ তাজুল স্মৃতি বেদিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের শ্রদ্ধা নিবেদন
বিভিন্ন দল, সংগঠনের পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে শহীদ তাজুলের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী বেদিতে ফুলে ফুলে ভরে যায়। আজ সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত অস্থায়ী শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। প্রথমে সিপিবি’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ-এর নেতৃত্বে সিপিবি’র কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর শহীদ কমরেড তাজুল পরিবারের পক্ষ থেকে শহীদ তাজুলের সহধর্মিনী নাসিমা ইসলামের নেতৃত্বে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বিপ্লবী ওয়ার্কাস পার্টি, গণফোরাম, ঐক্য ন্যাপ, বাসদ (মাকসবাদী), গণতন্ত্রী পার্টি, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, সাম্যবাদী দল (এমএল), বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি), বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন- কেন্দ্রীয় কমিটি ও বিভিন্ন শাখা, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন- কেন্দ্রীয় কমিটি ও বিভিন্ন শাখা, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, ডক্টরস ফর হেলথ এ্যান্ড এনভাইরনমেন্ট, সিপিবি নারী সেল, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি, সাপ্তাহিত একতা, লতিফ বাওয়ানি জুট মিল শ্রমিক ইউনিয়ন, জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, খেলাঘর আসর, সিপিবি’র ঢাকা কমিটি, বিভিন্ন থানা কমিটি ও শাখা, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট, ট্যানারি ওয়াকার্স ইউনিয়ন, হকার্স ইউনিয়ন, জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য পরিষদ, সমাজাতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ পুষ্পার্ঘ অর্পণের মাধ্যমে শহীদ তাজুলের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে পাঠ শেষে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সিদ্ধান্ত অনুসারে আদমজীতে শ্রমিকদের সংগঠিত করার লক্ষে তথা শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির সংগ্রামকে অগ্রসর করার মহান ব্রত নিয়ে আদমজী মিলে বদলি শ্রমিকের চাকরি নেন এবং সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ও সংগঠন গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৮৪ সালের ১ মার্চ দেশব্যাপী আহুত শিল্প ধর্মঘট ও হরতালের সমর্থনে আগের দিন মধ্যরাতে আদমজী জুটমিল এলাকায় কমরেড তাজুলের নেতৃত্বে শ্রমিকরা প্রচার মিছিল বের করলে, তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের গুন্ডাবাহিনীর হামলায় কমরেড তাজুল ইসলামসহ কয়েকজন শ্রমিক মারাত্মক আহত হন। ১ মার্চ ভোরবেলা গুরুতর আহত অবস্থায় কমরেড তাজুলকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির কিছুক্ষণ পরে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
বার্তা প্রেরক
কেন্দ্রীয় দপ্তর বিভাগ