বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তি-সংগ্রামের মহানায়ক কিংবদন্তি বিপ্লবী কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর শোকসভায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে বিপ্লবের প্রতীক কমরেড ফিদেল কাস্ত্রো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একেবারেই কাছে থেকেও তিনি কিউবার বিপ্লবকে সফল করেছেন। সাম্রাজ্যবাদের চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় অবরোধ, সকল ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে তিনি কিউবার বিপ্লবকে শুধু রক্ষাই করেননি, কিউবাকে বিস্ময়করভাবে অগ্রসর করে নিয়ে গেছেন। সাম্রাজ্যবাদ তাঁকে ছয়শর বেশি বার হত্যার প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। বিপ্লবী দৃঢ়তা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অনবদ্য বিপ্লবের নাম কমরেড ফিদেল কাস্ত্রো।
আজ ২৮ নভেম্বর মুক্তিভবনস্থ মৈত্রী মিলনায়তনে সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটি আয়োজিত শোকসভায় কমরেড সেলিম সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। শোকসভায় সূচনা বক্তব্য উত্থাপন করেন সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মো. কিবরিয়া। আরো বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খান, প্রেসিডিয়াম সদস্য হায়দার

আকবর খান রনো। কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আরো বক্তব্য রাখেন শ্রমিকনেতা মাহবুবুল আলম, ক্ষেতমজুর নেতা আনোয়ার হোসেন রেজা, কৃষকনেতা নিমাই গাঙ্গুলী, যুবনেতা হাফিজ আদনান রিয়াদ, উদীচী নেতা জামসেদ আনোয়ার তপন, গার্মেন্ট শ্রমিকনেতা কাজী রুহুল আমিন, আইনজীবী নেতা হাসান তারিক চৌধুরী, ছাত্রনেতা লাকী আক্তার। শোকসভাটি সঞ্চালনা করেন সিপিবি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য সাজ্জাদ জহির চন্দন। শোকসভার শুরুতে গণসংগীত পরিবেশন করেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীরা। শোকসভায় কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। শোকসভা শেষে প্রামাণ্যচিত্র ‘ফিদেল : দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ প্রদর্শিত হয়। শোকসভার আগে মুক্তিভবনে কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর প্রতিকৃতিতে সিপিবি ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়।
আজ সারাদেশে সিপিবি ঘোষিত ‘শোকদিবস’ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সর্বস্তরের কমিটিসমূহের উদ্যোগে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। সারাদেশে সিপিবি’র অফিসগুলোতে কালো পতাকা উত্তোলন এবং কাস্তে-হাতুড়ি খচিত দলীয় লাল পতাকা অর্ধনমিত রাখা

হয়। দলীয় নেতা-কর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করেন।
কেন্দ্রীয়ভাবে আয়োজিত শোকসভায় কমরেড সেলিম আরো বলেন, সমাজতন্ত্রের প্রশ্নে ফিদেল ছিলেন পাহাড়ের মতো অবিচল। সমাজতন্ত্রের ঝাণ্ডা নিয়ে বিশ্বের নিপীড়িত ও আক্রান্ত মানুষের পাশে তিনি দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর লড়াই কিউবায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ফিদেল কাস্ত্রো ও তাঁর দলের অকুণ্ঠ সমর্থনের কথা বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। কমরেড ফিদেল কাস্ত্রো বিশ্বের নিপীড়িত, নির্যাতিত, মুক্তিকামী মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে বেঁচে থাকবেন। বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে তিনি অনন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।
কমরেড মনজুর বলেন, কিউবার বিপ্লব অন্য সব বিপ্লব থেকে একেবারেই স্বতন্ত্র। শিক্ষা, চিকিৎসাসহ কিউবার সাফল্য বিস্ময়কর। কিউবার বিপ্লবের মহানায়ক কাস্ত্রো তাঁর দেশের জনগণকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শিখিয়েছিলেন। আর এই লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে লাতিন আমেরিকা থেকে সারা বিশ্বে। এই মহান বিপ্লবীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অসামান্য এক বিপ্লবী জীবনের অবসান হলো। তাঁর মৃত্যুতে একুশ শতকের সমাজতান্ত্রিক

আন্দোলনের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হলো। সারা বিশ্বের নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষ হারালো এক মহান নেতাকে। বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর নাম চিরঅক্ষয় হয়ে থাকবে।
কমরেড রনো বলেন, বিপ্লবী দৃঢ়তা আর সাহসের কারণে ফিদেল কাস্ত্রো মাত্র ৮২ জনকে নিয়ে কিউবার বিপ্লব শুরু করতে পেরেছিলেন। মতাদর্শগত অবস্থানের কারণে কিউবা অনেক ছোট দেশ হয়েও পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছিল। ফিদেলের নেতৃত্বে কিউবা যেমন অগ্রসর হয়েছে, তেমনি লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বামপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে তাঁর নেতৃত্বে উজ্জীবিত হয়ে। কিউবার জনগণকে ফিদেল শিখিয়েছিলেন, নিজের দেশের মানুষের জন্য লড়াই করা মহৎ, আর অন্য দেশের মানুষের জন্য লড়াই করা মহত্তর।
কমরেড কিবরিয়া বলেন, ফিদেল লাতিন আমেরিকার জনগণের হৃদস্পন্দন অনুভব করতেন। জনগণের ভাবনার সঙ্গে মার্কসীয়-লেনিনীয় মতাদর্শের সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন কিউবায়। হোসে মার্তির চিন্তার সঙ্গে মার্কসবাদের জীবন্ত সংযোগ ঘটিয়েছিলেন তিনি। তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ে তারুণ্যের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবেন।