ভূমিকা
২০০৮ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত নবম পার্টি কংগ্রেসের সময় দেশের ক্ষমতায় ছিল মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন-ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি এই সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল এবং একটানা ২ বছর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল। সেনা সমর্থিত ও অনির্বাচিত ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ এই সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো হরণ করেছিল। এই সরকারের শাসনকালের শেষের দিকে জরুরি অবস্থা কিছুটা শিথিল হওয়া মাত্রই আমাদের পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তার পরে গত ৪ বছরে দেশে অনেক ঘটনা ঘটেছে।
একই সাথে গত ৪ বছরে দক্ষিণ এশিয়াসহ সমগ্র বিশ্বে নানা ধরনের এবং অনেক সময় বিপরীতমুখী প্রবণতার ঘটনাও ঘটেছে। সে সব ঘটনার অভিঘাত আমাদের দেশের ঘটনাবলীর ওপরেও প্রভাব ফেলেছে।
নবম পার্টি কংগ্রেস শেষ হওয়ার পর পরই ২০০৮-এর ডিসেম্বরে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ সেনা সমর্থিত সরকার বিদায় নিয়েছে এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ‘মহাজোট সরকার’ ক্ষমতায় এসেছে। সেই সরকারের মেয়াদকালের তিন-চতুর্থাংশ ইতোমধ্যে পারও হয়েছে। স্বাভাবিক সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ছিন্ন না হলে, বছর খানেক পরেই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তী মেয়াদে কারা দেশ শাসন করবে- সে প্রশ্নটি ইতোমধ্যে প্রধান হয়ে উঠেছে। তাই পরবর্তী সরকার গঠনের সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি সব মহল নানাবিধ তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। জনগণের চিন্তা-ভাবনায়ও এই বিষয়টি এখন সামনে এসে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে, কী কর্মকৌশল নিয়ে অগ্রসর হলে কমিউনিস্ট পার্টি দেশের মানুষ তথা শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থকে বাস্তবসম্মত ও সবচেয়ে উপযোগীভাবে অগ্রসর করতে পারবে, তা নির্ধারণ করা এখন একটি বিশেষ কর্তব্য হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থিত। দেশের ও দেশের বাইরের বিভিন্ন ঘটনাবলীর বাস্তবসম্মত বিবেচনার ভিত্তিতে সেই কর্তব্য নির্ধারণ করতে হবে। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সাধনের মূল রণনৈতিক কর্তব্য এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি, সেই লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখে পার্টিকে তার আশু কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি
২০০৮ সালের আগস্টে পার্টির নবম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবার ঠিক আগে আগেই প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে ও পরে গোটা পুঁজিবাদী বিশ্বে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট ও মন্দা দেখা দিয়েছিল। এটি ছিল পুঁজিবাদের এ যাবৎকালের ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর সংকট। যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানিসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহ জনগণের ট্যাক্সের টাকায় গঠিত রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা ঢেলে দেউলিয়া হয়ে পড়া বহুজাতিক ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করেছিল। অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বন্ধের এবং বিরাষ্ট্রীয়করণের প্রবক্তা পুঁজিবাদী পন্ডিতরা সংকটগ্রস্ত পুঁজিবাদকে রক্ষার জন্য মুনাফার প্রাইভেটাইজেশন এবং লোকসানের রাষ্ট্রীয়করণ নীতি গ্রহণ করতে সামান্যতম দ্বিধা করে নাই। বস্তুত সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র যে জনগণের নয়, বরং একচেটিয়া ফিন্যান্স পুঁজির স্বার্থেরই রক্ষক- একথা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। বুর্জোয়া অর্থনৈতিক পন্ডিতদের নতুন সব তত্ত্ব পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সংকট নিরসনে যে ব্যর্থ হয়েছে, তা-ও আজ সুস্পষ্ট।
২০০৭-০৮ সালে সূচিত এবারের সংকট শুধুমাত্র পুঁজিবাদের নিয়মিত বাণিজ্য চক্রের সংকট ছিল না। পুঁজিবাদ তার বিকাশের গতিপথে আজ যে জায়গায় উপনীত হয়েছে, সেখানে তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই হলো ফিন্যান্স পুঁজির অস্বাভাবিক দাপট, যা দুনিয়াময় অবাধে ঘুরে বেড়ায়, যা প্রকৃত উৎপাদনশীল অর্থনীতিকে সহায়তা না করে দ্রুত ও সর্বোচ্চ মুনাফার সন্ধানে ফটকা কারবারে অধিক উৎসাহী হয়। এবারের এই সংকট ও মন্দা পুঁজিবাদের এই বৈশিষ্ট্যের ও ফিন্যান্স পুঁজিতাড়িত ধনতন্ত্রবাদের নয়া উদারবাদী পথের ব্যর্থতা ও অবধারিত বিষময় ফলাফলের প্রকাশমাত্র। এই সংকটের ফলে নয়া উদারবাদী পথের বিপদ সম্পর্কে জনগণের উপলব্ধি প্রসারিত হয়েছে এবং তার অভিঘাতে বিপুলভাবে বৃদ্ধি পাওয়া বেকারত্ব, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা ইত্যাদির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনগণের প্রতিবাদ বেড়েছে।
পুঁজিবাদের সর্বশেষ এই সংকট তার পচন দশার ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু পুঁজিবাদের পতন আপনা-আপনি ঘটে না। উপযুক্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যাভিমুখী আন্দোলন-সংগ্রামই পুঁজিবাদের অবসান নিশ্চিত করতে পারে। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অনুপস্থিতি এবং সাধারণভাবে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সাময়িক
দুর্বলতার কারণে বিশ্বপুঁজিবাদ প্রচন্ড ধাক্কা খেয়েও, সংকট কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে। তবে সংকট কাটিয়ে উঠতে পারার আগেই, নতুন করে আবারও অনুরূপ সংকটের আভাস দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বপুঁজিবাদের সাম্প্রতিক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সংকট মোকাবিলায় একত্রিত হয়ে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হয়েছিল সব ক’টি সাম্রাজ্যবাদী দেশকে। ২০০৮ সালের নভেম্বরেই ওয়াশিংটনে সবচেয়ে বড় ২০টি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের প্রধানদের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বকে বা অন্য কথায় জাতি-রাষ্ট্রসমূহের প্রতিযোগিতা সাময়িকভাবে অবদমিত অবস্থায় রেখে আন্তর্জাতিক পুঁজির স্বার্থে এক সঙ্গে কাজ করার এরূপ ঘটনা অতীতেও ঘটেছে। কিন্তু এতে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ শেষ বিচারে তাদের সংকট দূর করতে পারেনি।
গোটা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। এর কারণ যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে সামরিক ও রাজনৈতিক। এই কারণেই ডলারের আধিপত্য এখনো কোন চূড়ান্ত রকম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে না এবং বিশ্বজুড়ে আর্থিক সম্পদ প্রধানত ডলারেই ধরে রাখা হচ্ছে। এটা আবার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য সমগ্র বিশ্ব থেকে পুঁজি শুষে নিতে বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করেছে এবং বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রেখে গোটা দুনিয়াকে শোষণ ও লুণ্ঠন করার জন্য তাকে পথ করে দিচ্ছে।
২০০৮ সালে সংকট উত্তরণের জন্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো জনগণের টাকায় তৈরি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বড় বড় ব্যাংককে সাহায্য করেছিল এবং সেই ব্যয় পুষিয়ে নেবার জন্য জনকল্যাণমূলক খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় সঙ্কোচনের নীতি গ্রহণ করেছিল। অর্থাৎ সংকটের পুরো বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল জনগণের কাঁধে। তার থেকে জন্ম নিয়েছে নানা ধরনের গণবিক্ষোভ, প্রকৃতিগতভাবে যা কোনো না কোনোভাবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের কেন্দ্রেই এইভাবে সংকট কেন্দ্রীভূত হবার এই ঘটনাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এতো গভীরতা ও বিস্তৃতি নিয়ে এই প্রথম দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ইউরোপ-আমেরিকায় তাৎপর্যপূর্ণ গণবিক্ষোভ ও গণআন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে। গ্রীস, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড, রুমানিয়া, জার্মানি, বৃটেন, যুক্তরাষ্ট্র- কোনো রাষ্ট্রই এর বাইরে থাকেনি।
এই ক্ষেত্রে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো, সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ‘অকুপাই আন্দোলন’। প্রথমে নিউ ইয়র্কে (২০১০ সালে) ‘অকুপাই ওয়াল স্টিট’ দিয়ে শুরু হলেও, তা ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০০ শহরে এবং পরে লন্ডন, বার্লিন, রোম ইত্যাদি উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বের সকল কেন্দ্রসহ ৮২টি দেশের দেড় হাজারেরও বেশি শহরে। এই আন্দোলনের আরেকটি নামও তারা দিয়েছেন ‘এক শতাংশের বিরুদ্ধে আমরা নিরানব্বই জন’। যদিও এই আন্দোলনের কোন সুনির্দিষ্ট ও সুগ্রন্থিত রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল না এবং তার কোন কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বও ছিল না, তবু এই আন্দোলনের রয়েছে ব্যপক তাৎপর্য। যুক্তরাষ্ট্রসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের বিশাল জনগোষ্ঠী যে প্রচলিত পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে, তারই প্রতিফলন ঘটেছে এই আন্দোলনে। জনমত জরিপে জানা যায়, ‘অকুপাই’ আন্দোলনের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর সমর্থন রয়েছে। এই আন্দোলন এ বছরও অব্যাহত রয়েছে।
সাম্রাজ্যবাদের কেন্দ্রে এবং একই সাথে তার পরিধিতে, অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী লগ্নিপুঁজির ওপর নির্ভরশীল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে গণবিক্ষোভ ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা যথেষ্ট প্রবল হয়েছে এবং সমাজতান্ত্রিক কিউবা ছাড়াও ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, নিকারাগুয়া, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা প্রভৃতি দেশে বামপন্থী বা বাম ঘেঁষা সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে কাছে থেকেও তারা কম-বেশি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে। বর্তমানে সারা পুঁজিবাদী দুনিয়ায় (বাংলাদেশসহ) যেখানে চলছে নব্য উদারনীতিবাদের প্রয়োগ ও বেসরকারিকরণের তান্ডব, সেখানে ভেনিজুয়েলা ও বলিভিয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ’র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জনকল্যাণের স্বার্থে প্রধান শিল্প, বিদ্যুৎ, টেলিকম, তেল ও গ্যাস সম্পদকে জাতীয়করণ করেছে। সমাজতান্ত্রিক কিউবা ও হুগো শ্যাভেজের ভেনিজুয়েলার নেতৃত্বে মার্কিন কর্তৃত্বাধীন আঞ্চলিক জোটের পাল্টা গঠিত হয়েছে ‘আলবা’ জোট। এই বহুপাক্ষিক সংগঠন ডলারের ওপর নির্ভরশীলতাকে পরিত্যাগ করে
তৈরি করেছে নিজস্ব মুদ্রা ‘সুক্রে’। ২০০৮ সালে বারোটি সদস্য দেশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল ‘ইউনিয়ন অব সাউথ আমেরিকান নেশনস’ (উনাসুর)। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে বাদ দিয়ে পশ্চিম গোলার্ধের প্রায় সকল (৩৩টি) দেশকে নিয়ে গঠিত হয়েছে আরেকটি নতুন ব্লক- ‘কমিউনিটি অব লাতিন আমেরিকান এ্যান্ড ক্যারাবিয়ান স্টেটস’ (সেলক)। ৬০ কোটি মানুষের ৩৩টি দেশের এই ব্লকের জিডিপি হচ্ছে ৬ লক্ষ কোটি ডলার, যা বর্তমান বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এবং বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ’র অর্থনীতির বিকল্প গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে গঠিত এই জোট নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একক আধিপত্যনির্ভর এক মেরু বিশ্বে আজ বহুকেন্দ্রিকতার লক্ষণগুলি ফুটে উঠছে। মূলত অর্থনৈতিক সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে এসব অঞ্চলগত রাষ্ট্রীয় জোট গড়ে উঠলেও, তা বিশ্ব জুড়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী কেন্দ্রকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। যেমন ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার সমন্বয়ে গঠিত অর্থনৈতিক সহযোগিতার জোট ‘বিআরআইসিএস’ বা ‘ব্রিকস’। চীন, রাশিয়া, কাজাগিস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তানকে নিয়ে এবং ভারত, ইরান প্রভৃতি দেশকে পর্যবেক্ষক করে গঠিত হয়েছে ‘সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন’। তাছাড়া ‘আসিয়ান, সার্ক, আফ্রিকান ইউনিয়ন’ প্রভৃতি জোটের সক্রিয়তা ও গুরুত্ব বাড়ছে।
সাম্প্রতিককালের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো, একাধিক আরব দেশে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ। পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় বিস্তৃত আরব জগতের জনগণ কোনোদিন গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি। সৌদি আরবের মতো কোনো কোনো দেশে রয়েছে পুরোপুরি রাজতন্ত্র, যা আবার সাম্রাজ্যবাদের ঘাঁটি এবং প্রতিক্রিয়ার দুর্গ। অন্যান্য আরব দেশে রাজতন্ত্র না থাকলেও, আছে একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরশাসন। কয়েকটি দেশ সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-লুণ্ঠন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী অবস্থান গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেসব দেশের সরকারও ছিল অগণতান্ত্রিক, গণবিরোধী এবং প্রগতিশীল শক্তির বিরুদ্ধে। একের পর এক আরব দেশসমূহে গণতন্ত্রের দাবিতে সংঘটিত এসব স্বতঃস্ফূর্ত দুঃসাহসিক গণআন্দোলনের জোয়ার ছিল যেমন আকস্মিক, তেমনি বিস্ময়কর। এটা লক্ষ্যণীয় যে, আরব জাগরণের ঢেউ সৌদি আরবের মতো প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রেও ধাক্কা দিয়েছে। ইয়েমেন, জর্ডন, আলজিরিয়া, বাহরাইন, মরক্কো কোন দেশ বাদ যায়নি। নিঃসন্দেহে দুনিয়ার কমিউনিস্ট ও প্রগতিবাদীদের জন্য এটা আশার সংবাদ। এটাও লক্ষ্যণীয় যে, প্রায় একই সময়ে ইসরাইলেও শাসকবিরোধী সমাবেশ ঘটছে।
আরব জগতে প্রথম গণঅভ্যুত্থান শুরু হয় তিউনিশিয়ায় ২০১০ সালের ডিসেম্বরে, যা সেই দেশের স্বৈরশাসককে অপসারিত করতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর গণবিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল মিশরে ২০১১ সালের বসন্তকালে। আরব জগতের গণঅভ্যুত্থান তাই ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। মিশরের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ঢেউ লেগেছিল প্রায় সবকটি আরব দেশে। গণঅভ্যুত্থান দ্বারা মিশরের দীর্ঘকালীন স্বৈরশাসক এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বশংবদ হোসনে মোবারকের পতন ছিল গণতান্ত্রিক শক্তির বিরাট বিজয় এবং একই সঙ্গে তা ছিল সাম্রাজ্যবাদের বড় পরাজয়। অভ্যুত্থান ও মোবারকবিরোধী সংগ্রামে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল শ্রমিক শ্রেণীর এবং নতুন সংগ্রামী ধাঁচে গড়ে ওঠা ট্রেড ইউনিয়নসমূহের।
সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি প্রথম দিকে আরব দেশগুলিতে স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন দমন করার জন্য প্রচেষ্টা চালায়। পরে আন্দোলনকে তাদের স্বার্থে কাজে লাগাবার জন্য নানাভাবে প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। যেসব দেশের সরকার সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী অবস্থান গ্রহণ করে, সেসব দেশেও আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে তারা সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করে। আরব দেশসমূহের গণআন্দোলন যেন সেসব দেশে অর্থবহ পরিবর্তন আনতে সক্ষম না হয় এবং শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদ প্রভাবিত শাসকশ্রেণীই যাতে ক্ষমতায় আসে সে লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ, মৌলবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি যাবতীয় কর্মকান্ড গ্রহণ করে। এসব দেশে কমিউনিস্ট, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের উপর দীর্ঘকাল ধরে দমন-পীড়ন নির্যাতন ও নির্মূল অভিযান চলে আসছিল। এ ক্ষেত্রে সৃষ্ট শূন্যতার কারণে স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনগুলি তার অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি বটে, তবে জনগণের সংগ্রাম অব্যাহত আছে। লিবিয়ায় বিদ্রোহীদের পক্ষ নিয়ে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ন্যাটো বাহিনী। ২০০৩ সালে তারা ইরাক দখল করেছে। এবার ২০১১ সালে লিবিয়া দখল করেছে। এখন সিরিয়ার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
করছে তুরস্ককে ঘাঁটি করে এবং গণতন্ত্রের লেবাস পরে। লিবিয়া দখলের পর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আফ্রিকায় সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে। সেখানে রয়েছে আফ্রিকান কমান্ড। আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ সুদানকে ভেঙ্গে দক্ষিণ সুদান গঠন করেছে, যাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এখন তার সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করবে।
প্যালেস্টাইনের জনগণের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠীর বর্বর নির্যাতন এবং স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের অস্বীকৃতি অব্যাহত আছে। ২০১০ সালে প্যালেস্টাইনের সরকার জাতিসংঘে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছে। অবশ্য বরাবরের মতোই মার্কিন ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধীতার কারণে প্যালেস্টাইনের জনগণের স্বাধীন দেশ গঠন এখনো সম্ভব হয়নি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লাঠিয়াল হিসেবে জায়নবাদী ইসরাইল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তেল সমৃদ্ধ আরব জগতকে লুণ্ঠনের জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একদিকে জায়নবাদী ইসরাইল, অপরদিকে সৌদি আরব, জর্দান প্রভৃতি রাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে তেল বিক্রয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইরান দখলের হুমকি ও তৎপরতা অব্যাহত আছে। ইসরাইল এক্ষেত্রে উগ্র, আগ্রাসী ও প্রধান ভূমিকা পালন করছে।
এশিয়ার আরেক দেশ সমাজতান্ত্রিক উত্তর কোরিয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হুমকি ও সামরিক উসকানির মুখে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সেই সব ঘাঁটিতে আণবিক অস্ত্রও আছে। তাই এই অঞ্চলে সর্বদাই উত্তেজনা বিরাজ করছে। উত্তর কোরিয়া নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে মার্কিন প্রশাসনের হুমকিকে তোয়াক্কা না করে আণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ করেছে। দুনিয়ার সকল কমিউনিস্ট, শান্তিকামী ও গণতান্ত্রিক শক্তি কোরিয়া উপদ্বীপকে সম্পূর্ণভাবে আণবিক অস্ত্রমুক্ত করা এবং সেখান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে এবং মার্কিন প্রশাসনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ ও বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে আসছে।
আমেরিকা মহাদেশে অবস্থিত আরেকটি সমাজতান্ত্রিক দেশ কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ, উসকানিমূলক কাজ, সাবোটেজ ও চক্রান্ত অব্যাহত আছে অর্ধ শতাব্দী ধরে। প্রবল বৈরি পরিস্থিতি ও প্রতিকূলতার মধ্যেই কিউবাকে অগ্রসর হতে হচ্ছে। টিকে থাকার জন্য কিউবাকে অনেক ক্ষেত্রে সংস্কারের পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই বিপ্লবী কিউবা তার সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যকে এগিয়ে নিচ্ছে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বাধীন আজকের সাম্রাজ্যবাদ গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে উন্নয়নশীল দেশসমূহে বাজারসর্বস্ব অর্থনীতিক উদারনীতিবাদ চাপিয়ে দিয়ে বহুজাতিক কর্পোরেট পুঁজির যথেচ্ছ লুণ্ঠনের ক্ষেত্র উন্মুক্ত করেছে। এই ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে সাম্রাজ্যবাদেরই হাতিয়ার বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। সাম্রাজ্যবাদ অর্থনৈতিক হাতিয়ারের সাথে সাথে তার সামরিক আগ্রাসী তৎপরতাও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন ‘জাতি রাষ্ট্রের’ ক্ষেত্রে ‘সীমিত সার্বভৌমত্বের’ তত্ত্ব চাপিয়ে দিয়ে তার সুযোগে সাম্রাজ্যবাদ সারা দুনিয়ায় তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট রয়েছে। ‘একতরফাবাদ’ (ইউনিল্যাটারিজম) ‘আগাম আঘাত’ (প্রিয়েম্পটিভ এটাক), ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সংগ্রাম’ (গ্লোবাল ফাইট এগেইন্সট টেররিজম) ইত্যাদি নতুন নতুন আগ্রাসনের তত্ত্ব দিয়ে তারা গোটা বিশ্বকে আন্তর্জাতিক পুঁজির নিচ্ছিদ্র বাঁধনে বেঁধে ফেলার প্রয়াস জোরদার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হলেও, সেই উলঙ্গ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী নীতির কোন পরিবর্তন হয়নি। ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ায় দখল অব্যাহত রাখা, ন্যাটোর সম্প্রসারণ, পৃথিবীর কোনায় কোনায় সেনা ঘাঁটি স্থাপন, সামরিক বাজেট বৃদ্ধি (গোটা পৃথিবীর সকল দেশের মিলিত সামরিক বাজেটের চেয়ে শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট বেশি) ইত্যাদি ঘটনা তারই সাক্ষ্য বহন করে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার সহযোগী রাষ্ট্রসমূহ অর্থনৈতিক শোষণ ও সামরিক আগ্রাসনের পাশাপাশি মতাদর্শগত আক্রমণও বাড়িয়ে চলেছে। সাম্রাজ্যবাদের মিথ্যাচারকে জনসম্মুখে তুলে ধরা, তাদের ভন্ডামী ও গুন্ডামীর নীতিকে প্রকাশ করা এবং পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রামকে জোরদার করা আজ একটি জরুরি কর্তব্য হয়ে উঠেছে। পৃথিবীতে এখন আর সমাজতান্ত্রিক শিবির না থাকলেও, পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্ব
অপসারিত হয়নি। বরং তা মৌলিক দ্বন্দ্ব হিসেবে অবস্থান করছে। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মতাদর্শগত সংগ্রাম সেই সংগ্রামেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
একটা ভুল তত্ত্ব প্রায়ই প্রচার করা হয় যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এখন ‘ইসলামী’ জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে চলেছে। তাই মৌলবাদকে নির্মূল করার জন্য সাম্রাজ্যবাদের প্রতি সমর্থন জানানো বা তার প্রতি নমনীয়তা দেখানো উচিত। আবার তার বিপরীতে কেউ কেউ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতার নামে ইসলামী মৌলবাদের পক্ষে সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য সুপারিশ করেন। উভয় ধরনের চিন্তাই ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর। মনে রাখতে হবে যে, তালেবান, আল-কায়দা ইত্যাদি জঙ্গি মৌলবাদ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ মদদে এবং অর্থ ও অস্ত্র সাহায্যে তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশেও প্রধান মৌলবাদী দল জামাত-ই-ইসলামীর সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সুসম্পর্ক রয়েছে। তাই সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ উভয়ের বিরুদ্ধেই একই সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ উভয়ই প্রতিক্রিয়ার আধার। ফলে তাদের মধ্যে সংঘাত সত্ত্বেও কৌশলগত বোঝাপড়া হওয়া স্বাভাবিক বিষয়।
মতাদর্শ ক্ষেত্রে আরেকটি মারাত্মক প্রচারণা হলো, সমাজতন্ত্র এখন মৃত। তাই মানব সমাজের সামনে এখন লক্ষ্য হলো, পুঁজিবাদকে সংস্কার করে তাকে খানিকটা মানবিক চেহারা দেবার চেষ্টা করা। অথবা পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মিশ্রণে মানবমুক্তির একটি নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবন করা। এই সকল বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব ও ধারণার বিরুদ্ধে জোরের সঙ্গে মতাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনা করাও জরুরি। শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্বের পরিণতিতে সমাজতন্ত্র যে অবধারিত- সেই বৈজ্ঞানিক সত্যটিকে তুলে ধরে এটা দেখানো দরকার যে, মানব সমাজের সকল শোষণ, বৈষম্য ও নির্যাতন থেকে মুক্তি এবং মানবতার পরিপূর্ণ বিকাশ একমাত্র সমাজতন্ত্রেই সম্ভব। গত শতাব্দীর শেষ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয়ের পরও চীন, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া ও কিউবা প্রতিক্রিয়ার স্রোতকে প্রতিহত করে সমাজতন্ত্রের পতাকা উড্ডীন রাখতে সক্ষম হয়েছিল। তবে উপরোক্ত চারটি দেশই বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার করেছে। সব কয়টি দেশই রাষ্ট্রক্ষমতায় শ্রমিক শ্রেণী ও কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ এবং অর্থনীতির প্রধান অংশে সামাজিক মালিকানা বহাল রেখেই বিদেশি পুঁজিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং কম-বেশি ব্যক্তিগত ব্যবসা ও উৎপাদনের অনুমোদন দিয়েছে।
চীনের অর্থনৈতিক সংস্কার (ভিয়েতনামেরও) সম্পর্কে সে দেশের পার্টি বলছে যে, তারা সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, যখন ব্যক্তিমালিকানাধীন উৎপাদন, এমনকি বৃহদাকার পুঁজিবাদী উৎপাদনকে সাময়িক অনুমোদন দিচ্ছে। এই অবস্থায় পুঁজিবাদের প্রত্যাবর্তনের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। গোটা বিষয়টি নির্ভর করছে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রক্ষমতা কতটা মজবুত ও দক্ষ এবং কমিউনিস্ট পার্টি কতটা সতর্কতা ও দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির পরিচালনা করতে সক্ষম তার ওপর। চীনের এই সংস্কার অবশ্যম্ভাবীরূপে সে দেশের সমাজে নতুন করে বুর্জোয়া শ্রেণীর জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতের গতিধারা নির্ভর করবে দুই প্রবণতার এই দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণী ও বুর্জোয়ার মধ্যে কে জিতবে তার ওপর। এক্ষেত্রে ঘটনাবলীর গতিধারা আমাদেরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
বাংলাদেশের অবস্থান যে অঞ্চলে, সেই দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যবাদী তৎপরতা ও প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক তথ্য থেকে জানা গেছে যে, ভারত, নেপাল, বাংলাদেশে মার্কিন ‘স্পেশাল ফোর্সের’ সৈন্য অবস্থান করছে- যারা মার্কিন সেনাবাহিনীর প্যাসিফিক কমান্ড দ্বারা পরিচালিত। বাংলাদেশকে হানা, সোফা, টিকফা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহযোগিতা চুক্তি, পিআইএসসিইএস চুক্তি ইত্যাদি নানা চুক্তিতে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে প্রেরণ করা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে স্থায়ী মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য মরিয়া প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমেরিকা বাংলাদেশকে তার স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টাও এগিয়ে নিচ্ছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তে ভারত ও পাকিস্তান নতুন করে যে আণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের নিরপত্তাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
ভারত আমাদের নিকটতম ও বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ। ১৯৯১ সালে ভারত সরকার নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে। বিগত
দুই দশকে ক্রমবর্ধমান হারে রাষ্ট্রীয় সংস্থার ব্যক্তিখাতে হস্তান্তর ও শেয়ার বি-লগ্নীকরণ, শিক্ষা-চিকিৎসা-কৃষি প্রভৃতি পরিষেবায় বিদেশি পুঁজির অনুপ্রবেশ ইত্যাদির ফলে সে দেশে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির হার বেড়েছে, অপরদিকে বেড়েছে বৈষম্য ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর শোষণ। তৈরি হয়েছে কৃষি সংকট। দেশীয় বড় বুর্জোয়া ও কর্পোরেট পুঁজি কর্তৃক লুণ্ঠিত হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জনগণের সম্পত্তি। এর বিরুদ্ধে বামপন্থী শক্তি ও ট্রেড ইউনিয়নসমূহ লাগাতার সংগ্রাম করে আসছে। বামপন্থী ও শ্রমিকশ্রেণীর প্রতিরোধের কারণেই শাসকরা সকল আর্থিক ক্ষেত্রকে এখনো সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতে পারেনি।
ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতির দক্ষিণমুখী পরিবর্তন তার বৈদেশিক নীতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা দেশ ভারতের এক সময় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে ধরনের স্বাধীন ভূমিকা ছিল, দেশটি এখন সেখান থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত যে স্ট্র্যাটেজিক আঁতাত গড়ে তুলেছে, তা ভারতের ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এইভাবে ভারত সাম্রাজ্যবাদের ছোট শরিকে পরিণত হয়েছে, যা ভারতের জন্য ও একই সাথে এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের (বাংলাদেশসহ) জন্য বিপজ্জনকও বটে। এই উপমহাদেশে মার্কিন সৈন্যের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি আমাদের শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ভারতে বামপন্থী শক্তি যেমন বেশ শক্তিশালী, তেমনই সেখানে দক্ষিণপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিরও শক্ত অবস্থান আছে। ঐতিহাসিক কারণে ভারত ও বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি পরস্পরকে প্রভাবিত করে। সাম্প্রদায়িকতা উভয় দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট নেতৃত্বে পরিচালিত বামফ্রন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। তিন দশক ধরে একটানা জয়লাভ করার পর, এই পরাজয় নিঃসন্দেহে বড় ধরনের বিপর্যয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জনগণের ঐক্য গড়ে তোলা খুবই জরুরি। সেই জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও উপযুক্ত গণমঞ্চ গড়ে তোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতি-ধারার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০০৯ সালে মহাজোটের সরকার ক্ষমতায় আসার পর, দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। সিপিবি এটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছে। সমমর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থ সমুন্নত রাখার অবস্থানের ভিত্তিতে ভারত বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দুই দেশের জনগণের স্বার্থে এবং অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজনে খুবই জরুরি। তবে একথাও মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশে যেমন রয়েছে শোষক ও শোষিত- এই দুইটি বৈরি শ্রেণীর অস্তিত্ব, ভারতেও তেমনি রয়েছে শোষক ও শোষিত শ্রেণী। তাছাড়া ভারত একটি বুর্জোয়া রাষ্ট্র, যার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে সে দেশের বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণী। দু’ দেশের শোষিত মানুষের স্বার্থ অভিন্ন হলেও, ভারতের শোষক শ্রেণী এদেশের শোষিত মানুষকেও তাদের মুনাফার লালসার দৃষ্টি থেকেই বিবেচনা করে থাকে। শোষকদের আত্মস্বার্থান্ধতার কারণেই দু’ দেশের বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও সুসম্পর্ক ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার না থাকায়, সুসম্পর্ক প্রসারের ক্ষেত্রে নতুনভাবে নানা সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করা থেকে অকস্মাৎ ভারত সরকারের সরে যাওয়া, বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর টিপাইমুখ বাঁধ নির্র্মাণে ভারতের অনড় অবস্থান, একাধিক অভিন্ন নদীতে ভারতের একতরফাভাবে বাঁধ নির্মাণ, আন্তঃনদীসংযোগ মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে পানি সরিয়ে নেওয়া, ছিটমহল বিষয়ে চুক্তি বাস্তবায়ন ঝুলিয়ে রাখা, কাঁটাতারের বেড়া, লাগাতারভাবে সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক মানুষ হত্যা ইত্যাদি ঘটনাবলী দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি করেছে।
জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ইস্যুগুলো নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। সাথে সাথে একথাও মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পেলে, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতকে শক্তিশালী করবে। তারা বাংলাদেশের ভূখন্ডকে ভারতবিরোধী তৎপরতার জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করলে, তা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর ও বিপদজ্জনক হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর ও অবমাননাকর পদক্ষেপ নেয়া থেকে ভারত সরকারকে বিরত রাখতে, ভারত ও বাংলাদেশের প্রগতিশীল শক্তিকে যৌথভাবে
উদ্যোগ নিতে হবে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও জাতীয় সংহতি বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বরাবরের মতো পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রয়েছে একদিকে সামরিক বাহিনীর প্রভাব, অপরদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন হস্তক্ষেপ। পাকিস্তানের প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর মধ্যে তালেবান, আল-কায়দা ইত্যাদি ইসলামী মৌলবাদী শক্তির আদর্শগত ও সাংগঠনিক প্রভাব যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে মার্কিনি হস্তক্ষেপ খুবই গভীর ও অনেক পুরানো ঘটনা। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সেই দেশে সরকার, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রায় সরাসরি কাজ করে। আল-কায়দা ও তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রয়োজনে তারা পাকিস্তান সরকারের অনুমতির তোয়াক্কা না করেই পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বোমা বর্ষণ করছে, সামরিক তৎপরতা চালাচ্ছে। পাকিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন হামলা চালিয়ে সে দেশের নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করছে। একথা সবারই জানা যে, একদা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই পাকিস্তানের ভূমিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে তালেবান সৃষ্টি করেছিল। সব মিলিয়ে পাকিস্তান এখন রাষ্ট্র হিসেবেই খুব ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। পাকিস্তান এখন এই অঞ্চলে প্রতিক্রিয়ার দুর্গ হয়ে আছে। পাকিস্তানে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তি বেশ দুর্বল। তবে জনগণের মধ্যে তীব্র আমেরিকাবিরোধী মনোভাব বিরাজ করছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ‘আইএসআই’ বাংলাদেশে তৎপর রয়েছে। তারা মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মদদ জুগিয়ে চলেছে।
নেপালে রাজতন্ত্রের অবসান এবং কমিউনিস্ট শক্তির বিশাল আকারে আত্মপ্রকাশ এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ও আশাপ্রদ ঘটনা। ২০০৬ সালের গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কমিউনিস্টরা একচ্ছত্র শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে তারা পৃথক পৃথক দলে বিভক্ত। ২০০৮ সালে নবগঠিত সংবিধান সভার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং নেপাল রিপাবলিকে পরিণত হয়। তবে ৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও, পার্লামেন্ট এখনও সংবিধান রচনা করতে পারেনি। সম্প্রতি রাজনৈতিক সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। নেপালকে গণতন্ত্রের ধারায় নিতে হলে, মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টি (ইউ.এম.এল)’র মধ্যে সমঝোতা এবং ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস বিশেষ জরুরি। নেপালে গণতন্ত্রের সংগ্রামে প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়েছে। কিন্তু বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। নেপালে কমিউনিস্ট শক্তির উত্থান এবং গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং ভারতের বুর্জোয়া সরকার ভালো চোখে দেখছে না। দেশি-বিদেশি চক্রান্ত এখনও সক্রিয় আছে। দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে কমিউনিস্ট শক্তির এই বিকাশ আমাদের জন্য আনন্দের ও গর্বের বিষয়। নেপালের কমিউনিস্ট শক্তির অভিজ্ঞতাও আমাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারের রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। মায়ানমারে দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে সামরিক শাসন চলে আসছে। ২১ বছর বন্দী জীবনের পর সে দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রধান নেতা আন সাং সুচি’কে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ৪৫টি আসনে যে উপনির্বাচন হয়েছে, সেখানে তাঁর দল ৪৩টি আসন লাভ করেছে। মায়ানমারে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তাতে আশা করা যায় যে, শীঘ্রই সামরিক শাসনের সমাপ্তি হবে এবং সুচি’র দল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হবে। মায়ানমারের সামরিক সরকার দীর্ঘ সময় দেশকে গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। সাম্রাজ্যবাদের লোভী দৃষ্টি ছিল মায়ানমারের জ্বালানি তেলসহ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, এতকাল এই সম্পদ লুণ্ঠন করার সুযোগ পায়নি। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে মায়ানমারের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আছে। তাই মায়ানমারের সামরিক সরকারের প্রতি সাম্রাজ্যবাদের বিরূপ মনোভাব ছিল। সেই জন্যই মায়ানমারের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতি তারা বাহ্যিকভাবে সহানুভূতি জানিয়ে আসছে। মায়ানমারের রাজনীতিতে একদিকে সামরিক স্বৈরশাসনের অবসান এবং নির্বাচন ও সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হবার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুপ্রবেশের আশঙ্কা।
পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের বিদ্যমান বাস্তবতায় লুণ্ঠনের একটা উৎস হওয়া ছাড়াও, বাংলাদেশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে সামরিক-রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদেশকে কেন্দ্র করে আমেরিকা, পাকিস্তান, ভারত, চীন, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের নানা রকম স্বার্থ-সম্পৃক্ততা
রয়েছে। আমেরিকা তার ‘চীন ঠেকাও’ স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশকে অঙ্গীভূত করার প্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে। ভারত বাংলাদেশকে তার প্রভাব বলয়ের মধ্যে রাখতে আগ্রহী। পাকিস্তান, সৌদি আরব প্রভৃতি দেশ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিকে মদদ দিয়ে, এই অঞ্চলে তাদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে। এরা সবাই মার্কিনপন্থী দেশ। সম্প্রতি এই অঞ্চলে ইসরাইলের তৎপরতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন তার বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘চীন ঠেকাও’ অভিযান অকার্যকর করতে ও তার বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে সচেষ্ট। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক এসব শক্তির বহুমুখী স্বার্থ ও ভূমিকার অভিঘাত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলীকে প্রভাবিত করছে এবং তা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসররা দক্ষিণ এশিয়া ও তৎসংলগ্ন এলাকায় তার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য জোরদার করতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিককালে তারা এ অঞ্চলে তাদের সামরিক শক্তি ও অবস্থান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করে চলেছে। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, বিদেশে থাকা মার্কিন নৌশক্তির ৬০ শতাংশ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মোতায়েন করা হবে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আগাগোড়া এই অঞ্চলে ‘বিভেদ করো এবং শাসন করো’ নীতি নিয়ে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ওরা নানা কৌশলে দেশে দেশে দ্বন্দ্ব-বিরোধ-উত্তেজনা-সংঘর্ষ উসকে দেয়। বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরেও তারা নানাভাবে বিভেদ ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে সমাজ ও দেশকে দুর্বল করে দেয়। দেশগুলির মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা উসকে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী দেশ তাদের রমরমা অস্ত্র ব্যবসা বৃদ্ধি করতে থাকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে সামরিক স্ট্র্যাটেজিকসহ বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ করে ফেলে। সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করতে গিয়ে উন্নয়নশীল দেশসমূহের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিঘ্নিত হয় এবং সাম্রাজ্যবাদের উপর তাদের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের অগ্রগতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আজ এ অঞ্চলে বিরাজমান বিরোধসমূহের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে, উত্তেজনা হ্রাস করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে এবং সকল দেশ ও দেশের জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সর্বাত্মক ও বহুমাত্রিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য ও আগ্রাসন প্রতিহত করতে হবে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা
২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়। নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ‘দিন বদলের’ নীতি অনুসরণের যে আশ্বাস দিয়েছিল, বাস্তবে তার কোন প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং বিগত ৩৫ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ডব্লিউটিও, বহুজাতিক কোম্পানি এবং তথাকথিত দাতা দেশসমূহের নির্দেশে ও চাপে যে আত্মবিধ্বংসী নীতিতে চলে আসছিল, সে ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এই সরকারের আমলে বড় বড় অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি ও লুটপাট জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এগুলোর মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎখাতে ‘কুইক রেন্টাল’-এর নামে নানা ধরনের দুর্নীতি ও লুটপাট, ‘শেয়ার কেলেঙ্কারি’র মাধ্যমে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট, ‘পদ্মা সেতু’ নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতি, হলমার্ক-সোনালী ব্যাংকের বিশাল লুটপাট, ‘ডেসটিনি’ ও ‘যুবক’-এর অর্থ কেলেঙ্কারি, রেল মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ বাণিজ্যে ‘সত্তর লক্ষ টাকা’র দুর্নীতির কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। শাসক দল ও তার অঙ্গ সংগঠনসমূহের ভেতর, উপর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দুর্নীতি বিস্তার লাভ করেছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি ইত্যাদি নিয়ে নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ-হানাহানি, এমনকি প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটে চলেছে। সব মিলিয়ে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকার দলীয় লোকদের ব্যক্তিখাতে ৯টি ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। প্রতিটি ব্যাংকের জন্য এর প্রতিষ্ঠাতারা ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের শর্ত পূরণে সক্ষম হয়েছে বলে সরকার বলছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এত অর্থ তারা কোন্ উৎস থেকে পেলেন। দুর্নীতি, লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নটি এখন সামনে চলে এসেছে।
২০০৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈশ্বিক পুঁজিবাদী সংকটের ধাক্কা নেমে আসে। আশঙ্কা করা হয় যে, রপ্তানিখাতে বিশেষ করে পোশাক শিল্পের রপ্তানি আয়ে ধ্বস নামবে। সেই সঙ্গে বৈদেশিক সাহায্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাস পাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের
শ্রমিকদের প্রেরিত রেমিটেন্স হ্রাস পাবার আশঙ্কাও করা হয়েছিল। বাস্তবে তেমনটি হয়নি। এই কৃতিত্ব প্রধানত আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষ এবং প্রবাসে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের। পোশাকশিল্প খাতে সস্তা শ্রম কাজে লাগিয়ে শ্রমিকদের উপর শোষণের মাত্রা তীব্র করে, সরকারি প্রণোদনার সমর্থন নিয়ে এবং উৎপাদন ও বাজার বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে। এই সময় আমাদের কমরেডদের নেতৃত্বে পোশাকশিল্প খাতে তীব্র আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আংশিক সাফল্য অর্জিত হয়। তবে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির ফলে প্রকৃত মজুরি ইতোমধ্যেই আবার হ্রাস পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্স প্রবাহে সাময়িক সংকট সৃষ্টি হলেও, বর্তমানে তা পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিক্ষেত্রেও উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা ঊর্ধ্বমুখী হতে ও স্থিতিশীলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। সামগ্রিকভাবে আমাদের জি.ডি.পি’র প্রবৃদ্ধির হার এ সময়কালে ৬ শতাংশের নীচে না নামলেও, ঈপ্সিত ৭ বা ৮ শতাংশ হারের প্রবৃদ্ধি বা উচ্চতর প্রবৃদ্ধির হার অর্জিত হয়নি। অর্জিত প্রবৃদ্ধির হারের ফসলও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। বরং মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে সম্পদের পাহাড়। বৈষম্য বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
দারিদ্র দূরীকরণের জন্য বর্তমান সরকারের প্রধান কৌশল হচ্ছে প্রবৃদ্ধি এবং কতিপয় দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও এলাকার জন্য কতিপয় সুনির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। যেহেতু বর্তমান সমাজে ক্ষমতা, সম্পদ ও শিক্ষার ক্ষেত্রে এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য বিদ্যমান, সেহেতু এই মৌলিক জায়গায় কোন পরিবর্তন না এনে দারিদ্র দূরীকরণের এসব চেষ্টা কতকগুলি নিছক এ্যাডহক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। উচ্চতর প্রবৃদ্ধি যদি অর্জিতও হয়, তাতে এর সুফল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তুলনামূলকভাবে সব সময় কম পাবে। ফলে ধনীদের শ্রী বৃদ্ধি হবে খরগোশের গতিতে এবং দরিদ্রদের দারিদ্র্য কমবে শম্বুক গতিতে। ১৯৯১-৯২ সালে সর্বোচ্চ ৫% মানুষের আয় ছিল সর্বনিম্ন ৫% মানুষের আয়ের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। ১৯৯৫-৯৬ সালে সেটা ছিল ২৭ গুণ বেশি। ২০০০ সালে সেটা হয়েছিল ৩০ গুণ বেশি। ২০০৫ সালে সর্বশেষে সেটা হয়েছে ৩৫ গুণ বেশি। অর্থাৎ ১৯৯১ থেকে ২০০৫ এই কালপর্বে বাংলাদেশে আয়-বৈষম্য বিরতিহীনভাবে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। একই ধারা এখনো অব্যাহত আছে। বৈষম্য ও দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য প্রয়োজন আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন, যা এই সরকারের কর্মসূচিতে নেই।
সরকারের ভ্রান্ত অর্থনৈতিক নীতি ও পদক্ষেপের কারণে ব্যাংকের তারল্য সংকট বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, বৈদেশিক মুদ্রা মজুদের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছিল। ব্যাংক সুদের হারের অনিয়ন্ত্রিত ওঠানামা, টাকার মূল্য মানের হ্রাস ইত্যাদি অর্থনীতিতে টালমাটাল অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। নাজুক পরিস্থিতি সাময়িকভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলেও, অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতার উপাদান এখনো দূর হয়নি।
বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে বন্ধ কল-কারখানা চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। বিশেষত পাট শিল্পকে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। লোক দেখানো কয়েকটা পাটকল চালু করলেও, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, নীতিহীনতা ইত্যাদির কারণে সেগুলো পুনরায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকট সমাধানে ব্যর্থতার কারণে, পুরনো-নতুন সকল শিল্পখাতে পুনরুদ্ধার কর্মসূচি এবং নতুন বিনিয়োগ কর্মসূচি বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকার অবকাঠামো খাতে ব্যক্তি খাতের সঙ্গে যৌথভাবে পার্টনারশিপ তথা পি.পি.পি. নীতি প্রণয়ন করে। এই উদ্যোগের ফলাফলটি কার্যত শূন্য। বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি উদ্যোগ কিছু এগিয়ে আসলেও, তার জন্য দেশের মানুষকে উচ্চ মূল্য দিতে হচ্ছে।
২০০৮ সালে যখন বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল, তখন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির গড় হার ছিল প্রায় ৮ শতাংশ। সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল এটাকে আরো কমিয়ে ৩/৪-এর মধ্যে নিয়ে আসা। টিসিবি’কে শক্তিশালী করা, রেশনিংসহ গণবণ্টন ব্যবস্থা চালুর সরকারি প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায়, এক্ষেত্রে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং বর্তমানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির গড় হার দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে গিয়েছে। দ্রব্যমূল্য এখন প্রায় বার্ষিক ১২ শতাংশ হারে বাড়ছে, এর প্রবল চাপে স্থির আয়ের জনগোষ্ঠী বর্তমানে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ঝোঁকটা আবার বিশেষভাবে পড়েছে খাদ্যমূল্য এবং বাড়ি ভাড়ার উপর। ফলে এই ধাক্কাটা গরিব, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত জনগণের উপর তুলনামূলকভাবে
অধিকতর তীব্র হয়েছে। বাজার শুধু অনিয়ন্ত্রিত নয়, ভেজাল, বিষাক্ত পণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে।
আমাদের দেশের অর্থনীতিতে কৃষিখাতের অবদান উল্লেখযোগ্য এবং দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল হলেও, কৃষিখাতে সরকারের ব্যয় বরাদ্দ ক্রমাগত কমছে। স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক বছর এ খাতে বরাদ্দ প্রায় ৩০% হলেও, বর্তমানে তা ৯%-এর নিচে নেমে এসেছে। এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ ‘দাতা’ সংস্থার চাপে ৮০’র দশক থেকে বীজ, সেচ ও সারের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বিলুপ্ত করে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে দফায় দফায় এগুলোর মূল্য বৃদ্ধি হয় এবং সংকট সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি কৃষি উপকরণের উপর কিছু ভর্তুকি চালু করা হলেও, এই ভর্তুকির টাকা চলে যাচ্ছে সার, বীজ, কীটনাশক ব্যবসায়ী ও সেচযন্ত্রের মালিকদের কাছে। প্রকৃত কৃষকের তেমন কোন উপকার হচ্ছে না। সম্প্রতি দেশের কৃষক সমাজের প্রচেষ্টায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও, কৃষকরা ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। সরকারের নীতির কারণে তা চলে যাচ্ছে ফড়িয়া ব্যবসায়ী চাল-কল মালিক ও মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের হাতে। এভাবে কৃষি থেকে সম্পদ উঠিয়ে এনে লুটেরা পুঁজি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া হচ্ছে। সার, বীজ, কীটনাশক, বিদ্যুৎ, ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি ও এসবের উপর বহুজাতিক কোম্পানি ও ধনিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে হাইব্রিড ও বন্ধ্যা বা টার্মিনেটর বীজের বাজারে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে কৃষি ও কৃষককে বহুজাতিক কোম্পানির অবাধ শোষণের কাছে ক্রমেই জিম্মি করা হচ্ছে। সম্প্রতি কৃষিতে ভর্তুকি আরো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউরিয়া সার, ডিজেল ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি কৃষিতে নতুন সংকট সৃষ্টি করছে। ভূমি ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার, কৃষি সংস্কার ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রগতিশীল পুনর্গঠনে হাত না দেওয়ার ফলে নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
আওয়ামী সরকারের আমলে অনেক সীমাবদ্ধতাসহ একটি শিক্ষানীতি প্রণীত হয়। এই শিক্ষানীতিতে ছাত্রসমাজসহ দেশবাসীর দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি। সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে আপোস করা হয়েছে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য বহাল রাখা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করে তা সরকারি খরচে নির্বাহের ঘোষণা প্রদান করা হয়। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়ন করা হয়। তবে এই শিক্ষানীতিতে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ না করে তা প্রসারিত করা হয়েছে এবং একমুখী শিক্ষার প্রবর্তনের দাবি অগ্রাহ্য করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সম্প্রতি পল্লী অঞ্চলে ভর্তির হারে লক্ষ্যণীয় উন্নতি হলেও, অর্থনৈতিক কারণে পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণির পর ঝরে পড়ার (Drop-out) হার এখনো তেমন একটা কমেনি।
দেশের উচ্চ শিক্ষাকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত করার মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষাকে ধ্বংস করতে বিশ্বব্যাংক নানা অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের চাপের কাছে নতি শিকার করে ‘ইউজিসি কৌশলপত্র’ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে, যার উদ্দেশ্য উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবসায়িক ‘খামারে’ পরিণত করা। বিভিন্ন ধারার শিক্ষা, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, শিক্ষাক্ষেত্রে অসমতা, বৈষম্য, নৈরাজ্য, অপসংস্কৃতি, কুপমন্ডুকতা, ভোগবাদ, মুনাফা-সর্বস্বতা, আত্মকেন্দ্রিকতা গোটা সমাজকে অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন ধারার ও বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষকদের বেতন, শিক্ষার মান, শিক্ষার অবকাঠামো ইত্যাদি ক্ষেত্রে এখনো আকাশ-পাতাল বৈষম্য বিরাজমান। শিক্ষা ব্যবস্থার এসব অসুবিধা তখনই অনেকটা দূর করা সম্ভব হবে, যখন বাজেটে জাতীয় আয়ের ৮ শতাংশ অর্থ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হবে। বর্তমানে এই ব্যয়ের হার মাত্র দুই থেকে আড়াই শতাংশের আশে পাশে বিরাজমান। এই মাত্রার শিক্ষা-ব্যয় দিয়ে বাংলাদেশকে কখনোই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর করা সম্ভব হবে না।
সমাজের নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়, ঘুষ-দুর্নীতি, অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। আমাদের দেশের যুব সমাজের বিপুল অংশ বেকার। ফলে তাদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। একটা বড় অংশের মধ্যে বাড়ছে মাদকাসক্তি, অপরাধ প্রবণতা।
যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় চলছে চরম সংকট। পরিবহণ ব্যবস্থায় এক নৈরাজ্যকর অবস্থা চলছে। নৌ-যাতায়াত ব্যবস্থা অবহেলিত। রেল ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। রাস্তা-ঘাট যান চলাচলের অনুপযোগী। গণপরিবহণ ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, যানজট, বাড়ি-গাড়ী ভাড়া বৃদ্ধি, হত্যা,
ছিনতাই, রাহাজানি, নারী-শিশু নির্যাতন, অপহরণ, পাচার ইত্যাদি ক্রমবর্ধমান। ক্রসফায়ার, গুম, খুন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর পেছনে দেশি-বিদেশি মহলের হাত থাকার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এসব সমস্যা সমাজ ও রাজনীতিতে অস্থিরতা ও নৈরাজ্যের উপাদান হিসেবে বিরাজ করছে।
আমাদের সীমিত তেল-গ্যাস-কয়লা সম্পদের উপর বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার নীতি অব্যাহত আছে। এই সময় রপ্তানিমুখী ‘পিএসসি’র মাধ্যমে সমুদ্রের ২টি গ্যাস-ব্লক অনুসন্ধানের জন্য মার্কিন কোম্পানি ‘কনকো ফিলিপস’কে ইজারা দেয়া হয়েছে। মায়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা-বিরোধ নিষ্পত্তির পর, আরো কয়েকটি ব্লক তাদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। ফুলবাড়ীতে জনগণের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মুখে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। অতি অল্প অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পরও, ‘বাপেক্স’ যে সাফল্য দেখিয়েছে, তাতে আরেকবার এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, স্থানীয় সক্ষমতা দিয়েই বহুজাতিক কোম্পানির তুলনায় কম সময়ে কম খরচে আমরা আমাদের তেল-গ্যাস সম্পদ উত্তোলনে সক্ষম। গ্যাস সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপচয় রোধ এবং জ্বালানি সম্পদের উপর আমাদের শত ভাগ মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে নানা ধরনের এনজিও এখন কাজ করছে। সাম্রাজ্যবাদের চাপিয়ে দেয়া নীতির ফলে সৃষ্ট গণদারিদ্র, বৈষম্য, বেকারত্ব ও সামাজিক অসন্তোষ প্রশমনের লক্ষ্যে ‘নিরাপত্তা জাল’ (safety net) হিসেবে কাজ করার উদ্দেশ্যেই মূলত তারা ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে ‘দাতা’ দেশ ও সংস্থাগুলোর প্রদত্ত সাহায্য সরকারের পরিবর্তে বেশি করে এনজিও’র মাধ্যমে প্রদানের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এনজিও পুঁজির একটি অংশ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যাংকিং, সার্ভিস সেক্টরসহ ব্যবসা-বাণিজ্য, চড়া সুদে ঋণ প্রদান ও শিল্পখাতের দিকে ধাবিত হয়ে কর্পোরেট সেক্টরের রূপ লাভ করেছে। এতে উচ্চ বেতনভোগী নতুন এক এনজিও এলিট শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে।
ক্ষুদ্রঋণ প্রদান কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধ গরিব মানুষের জন্য একটি যন্ত্রণাদায়ক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জামাতসহ সাম্প্রদায়িক শক্তিও সারাদেশে বিদেশি অর্থে ব্যাংক, ক্লিনিক, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নামে এনজিও’র জাল বিস্তার করে সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি করে চলেছে। এছাড়া অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এনজিও রয়েছে, যারা নানা ধরনের সংস্কারমূলক কাজে নিয়োজিত। সার্বিক বিচারে এদের কাজ সংস্কারবাদী ও দীর্ঘমেয়াদী বিবেচনায় বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। অনেকের ভূমিকা বহুলাংশে নেতিবাচক হলেও, তাদের কারো কারো কিছু কাজের তাৎক্ষণিক সুফলও আছে। এনজিওগুলো পরিচালনা সম্পর্কে অস্বচ্ছতা, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগও আছে। এনজিওগুলোর মধ্যে নানা দ্বন্দ্ব-অসন্তোষ, মতবিরোধও আছে। বড় বড় সংস্থাসহ অনেক এনজিও দ্বি-দলীয় বুর্জোয়া রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আবার ‘সুশীল সমাজ’ নামে বিরাজনীতিকীকরণের নানা প্রক্রিয়ার সাথে তারা অনেকেই জড়িত আছে। এরা বাংলাদেশে বর্তমানে একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ‘সুশীল সমাজের’ নামে তারা নানা ক্ষেত্রে এবং সুযোগ মতো রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তার করতে তৎপর রয়েছে। কিছু এনজিও বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদের ‘বিশেষ’ এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিশেষভাবে তৎপর হয়ে উঠছে। সামগ্রিক বিচারে বিদেশি সাহায্যভিত্তিক এসব কর্পোরেট এনজিও প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম একটি নেতিবাচক ও বিপজ্জনক উপাদান। এদেশের সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মানুষ ও আদিবাসীরা এখনো অধিকারবঞ্চিত অবস্থায় রয়ে গেছেন। সমতলে এবং মূলত পার্বত্য অঞ্চলে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করেন। পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ও সমতলে ভূমি সমস্যার জটিলতা সমাধানে এখন পর্যন্ত সরকার তেমন বিশেষ কোন কর্মসূচি হাতে নেয়নি। এই সরকারের পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়ার পরিবর্তে সবাইকে বাঙালি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন অব্যাহতভাবে বাড়ছে।
সরকারের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ প্রশ্নে নানা নীতিগত ও সাংবিধানিক আপোসের ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন বেড়েছে। ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দেশ ত্যাগের প্রবণতাও বেড়েছে। অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিল হলেও, তা সম্পূর্ণ কার্যকর করার ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের নারী সমাজের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি লক্ষ্যণীয়। পোশাক শিল্পের উপজাত (byproduct) হিসেবে এদেশের
অল্প বয়সী শ্রমজীবী নারীরা অর্থনীতি ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সদর্প পদচারণা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রম প্রদানের ক্ষেত্রে নারী সমাজ বিশেষ করে গ্রামীণ নারী সমাজের অংশগ্রহণ বেড়েছে। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে কিছুটা অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষেই সম্পত্তির সমউত্তরাধিকার, পরিবারের ভিতরে বৈষম্য, ধর্মীয় পশ্চাৎপদতা, নারী নির্যাতন- এগুলি এখনো নারী সমাজের অগ্রগতির বিরুদ্ধে প্রধান বাধা হিসেবে টিকে রয়েছে। নারী উন্নয়ন নীতির ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সরকার তার পূর্বের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তনসহ একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক-সামাজিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া নারী সমাজের সামগ্রিক সংকট দূর করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের পরিবেশ, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য আজ লুটপাট ও মুনাফার যুপকাষ্ঠে বলি হচ্ছে। বন ও গাছপালা ধ্বংস, খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর এমনকি নদী দখল ও ভরাট, পাহাড় কাটা, পানি ব্যবস্থাপনার অভাব, আর্সেনিক দূষণ, মৃত্তিকার ক্ষয়প্রাপ্তি, জমির উর্বরতা হ্রাস, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, নদী ও সমুদ্র দূষণ, বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি, ফসল ও জীববৈচিত্র্যের ধ্বংসপ্রাপ্তি, জীবন, স্বাস্থ্য ও প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর সার, কীটনাশক, কেমিক্যাল, জেনেটিক্যালি মডিফাইড বীজের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার, আমদানি ও অনুপ্রবেশ প্রভৃতি সারা দেশে এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। আমাদের মতো অনুন্নত দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উন্নত ধনবাদী দেশসমূহ দায়ী। বহুজাতিক কোম্পানির অদক্ষতা ও অবহেলার কারণে আমাদের দেশের টেংরাটিলা ও মাগুরছড়ার গ্যাস বিস্ফোরণের ফলে, আমাদের হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাসসম্পদসহ পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। সুন্দরবনের কাছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মিত হলে আমাদের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ হুমকিতে পড়বে। বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ট্রাজিক শিকার হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। বন্যা-ঘূর্ণিঝড়-সাইক্লোনের তীব্রতা বাড়ছে।
বর্তমানে শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুর-মেহনতি মানুষ, মধ্যস্তরের জনগণ, উৎপাদক ও উদ্যোক্তা শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা না করে তাদেরকে শোষিত ও বঞ্চিত করে কতিপয় দেশীয় পরজীবী লুটেরা ধনিক ও বিদেশি লুটেরাদের শ্রেণী স্বার্থ রক্ষার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ফলে সমাজে ধন-বৈষম্য এক নগ্ন রূপ ধারণ করেছে। একদিকে বিপুল সম্পদের মালিক এবং অকল্পনীয় বিলাস-বৈভবে ডুবে থাকা এক লুটেরা ধনিক শ্রেণী, চোখ ধাঁধানো সম্পদের পাহাড়, ভোগবাদ, অপচয়, অপসংস্কৃতি, বিচ্ছিন্নতার এক জগত। অপরদিকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, বেকারত্বে জর্জরিত সাধারণ মানুষ। এই বৈষম্য সমাজে তীব্র অসন্তোষের পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জাতির জন্য ঐতিহাসিক মাইলফলক। পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীলতা ছিন্ন করে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার রাষ্ট্রীয় মূল নীতির ভিত্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরু থেকেই সেই পথে দেশ পরিচালনার কাজে ছিল নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি, ঘাটতি এবং বিরুদ্ধ পক্ষের প্রতিবন্ধকতা। নানা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সেই পথ থেকে দেশকে ’৭৫ সালে বিপথগামী করা হয়। তার পর থেকে কয়েক দশক ধরে দেশে চলছে সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা ধনিক শ্রেণীর শাসন। এ সময়কালের মধ্যে দেড় দশক ধরে দেশে চলেছে প্রত্যক্ষ বা বেসামরিক লেবাসে সেনাশাসন। ১৯৯০-এ সামরিক এরশাদ স্বৈরাচারের পতনের পর নির্বাচিত বেসামরিক সরকার ও সাংবিধানিক শাসনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর ২২ বছর পার হয়েছে। এর মাঝে ২ বছরের সেনা সমর্থিত ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ সময়কাল বাদ দিলে, ২ দশক ধরে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দু’টি বড় বুর্জোয়া দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পালাক্রমে ৪ বার হাত বদল হয়েছে। তারা ক্ষমতার প্রয়োজনে অন্যান্য দলকে নিয়ে কৌশলগত ঐক্য, গোপন সমঝোতা, জোট-মহাজোট গঠন ইত্যাদির সহায়তায় দেশের রাজনীতিকে কার্যত তাদের নিজ নিজ স্বতন্ত্র দু’টি বলয়ে বেঁধে ফেলেছে। দেশি-বিদেশি শাসক শোষক শ্রেণীর পরিকল্পনা এবং তাদের অগাধ অর্থশক্তি, প্রচার মাধ্যমের ওপর তাদের আধিপত্য ইত্যাদির মদদে নানা পথ ও পন্থায় এদেশের রাজনীতিকে দ্বি-দলীয় মেরুকরণভিত্তিক বৃত্তে শক্তভাবে বেঁধে ফেলা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারগুলো সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর মুক্তবাজার অর্থনীতির দর্শন অনুসরণ করায় এদেশে বিনিয়োগমুখী ধনতন্ত্রের বদলে লুটপাটতন্ত্র কায়েম হয়েছে। আমাদের দেশে এটিই হলো ধনতান্ত্রিক
পথের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। এর ফলে রাজনীতিতে বেড়েছে বাণিজ্যিকীকরণ, দুর্বৃত্তায়ন ও আদর্শহীনতার প্রবণতা। কলুষিত হয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বস্তুত এই দুই বুর্জোয়া দলের নেতৃত্বে এসব আত্মঘাতী প্রবণতা এমন মাত্রা ও রূপ পেয়েছে যে, সেই অপশক্তির হাতে তারা নিজেরাই আজ জিম্মি হয়ে পড়েছে। জনগণের সম্পদ লুটপাট ও লুটের মাল ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দুই দল ও জোটদ্বয়ের মধ্যে তো বটেই, এমনকি নিজ নিজ দল ও জোটের মধ্যেও হানাহানি, সংঘর্ষ, দ্বন্দ্ব এবং এসবের ফলে স্থায়ী নৈরাজ্যের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দেশের রাজনৈতিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। শাসকশ্রেণীর জন্যও এ ধরনের নৈরাজ্য ও অনিশ্চয়তা মাঝে মধ্যেই অস্বস্তিকর ও অসহনীয় হয়ে উঠছে। এই অবস্থার সুযোগে দু’পক্ষকে সমঝোতায় নিয়ে আসার কথা তুলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি শক্তি হরহামেশাই সরাসরি হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। সেই সুযোগে তারা উভয় বুর্জোয়া দলের নিকট থেকে নানা ধরনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক কনশেসন আদায় করে নিতে সক্ষম হচ্ছে। অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে, তারা ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ মতো তাদের নিজস্ব ‘অরাজনৈতিক’ বিকল্প চাপিয়ে দেয়ার সুযোগও গ্রহণ করছে। বুর্জোয়া রাজনীতির সংকট ও দেউলিয়াপনার ফলে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব, সংঘাত, হানাহানি, নৈরাজ্য ও অনিশ্চয়তার মুখে ২০০৭ সালে তারা সে রকম পদক্ষেপই গ্রহণ করেছিল। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এখনো এই চিত্র বিরাজ করছে।
পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশ ও অন্যান্য বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ ইন্ধন ও সহায়তায় এদেশে ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে ২ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পেরেছিল। সেই সরকারের পরিচালক হিসেবে জনগণের সামনে যে সব ব্যক্তির নামই থাকুক না কেন, সেই দু’বছর রাষ্ট্রের প্রকৃত কর্তৃত্ব আসলে ছিল সেনাবাহিনীর হাতে। সাথে ছিল ‘সুশীল সমাজ’ বলে দাবিদারদের একাংশ। পেছন থেকে কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করতো সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী বিদেশি শক্তি। এই সরকারের মাধ্যমে তারা তাদের নিজস্ব স্বার্থের এজেন্ডাগুলো এগিয়ে নিতে তৎপর হয়েছিল। এই সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করেছিল।
দুই বড় বুর্জোয়া দলের উপর জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠার বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে তারা ‘বিরাজনীতিকীকরণের’ ধারায় ‘সুশীল সমাজের’ শাসনের ফর্মুলা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিল। বস্তুত সবটাই ছিল সাম্রাজ্যবাদের মদদে ও সেনাবাহিনীর পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা একান্ত অনুগত ব্যক্তি ও শক্তির দ্বারা দেশ শাসনের প্রয়াস। তারা ‘রাজনৈতিক সংস্কারের’ ধুয়া তুলে নানা ফন্দি-ফিকির করে ‘কিংস পার্টি’ গঠনের তৎপরতা শুরু করেছিল। দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে তারা রাঘব-বোয়ালদের শায়েস্তা করার কথা বলে কিছু ‘ভিআইপি’ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে চমক সৃষ্টি করতে পারলেও, অচিরেই তাদের হাতে তা একদিকে স্রেফ ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’ এবং অন্যদিকে তাদের রাজনৈতিক প্রজেক্টের জন্য চাপ প্রয়োগের অস্ত্রে পরিণত হয়েছিল। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিসহ নানাবিধ অত্যাচার-দমন-পীড়নের ঘটনায় মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকারের গণবিরোধী চরিত্র দ্রুতই উন্মোচিত হতে শুরু করেছিল।
জনগণের মধ্যে নানা কারণে সৃষ্ট ক্ষোভ, ‘মাইনাস-টু’ ও ‘রাজনৈতিক-সংস্কারের’ আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ, নিজেদের মধ্যে দুর্নীতি-দ্বন্দ্ব-বিবাদ-বিশৃঙ্খলা ইত্যাদির ফলে ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ সরকারকে তার রাজনৈতিক ব্লু-প্রিন্ট বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা থেকে মাঝ পথে সরে আসতে হয়েছিল। ‘রাজনৈতিক সংস্কার’ চাপিয়ে দেয়ার প্রজেক্ট থেকে সরে এসে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পথে তাকে ফিরে যেতে হয়েছিল। ফলে, ‘মাইনাস-টু’র নিস্ফল প্রচেষ্টার জবাবি প্রতিক্রিয়ায় বরং উল্টা দুই নেত্রীর আধিপত্য ও রাজনীতিতে দ্বি-মেরুভিত্তিক ব্যবস্থা আরো শক্তভাবে পুনঃস্থাপিত হয়েছিল।
অতঃপর নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার উৎক্রম প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে শাসকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত দেশি-বিদেশি নানা মহলের তৎপরতা শুরু হয়েছিল। বুর্জোয়া দল দু’টির সাথে পর্দার অন্তরালে সেনা কর্মকর্তাসহ ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ দেশি-বিদেশি শক্তিগুলোর চলেছিল নানা কথাবার্তা, দেন-দরবার, লেনদেন, প্রতিশ্রুতির আদান-প্রদান। ক্ষমতার জন্য মরিয়া হওয়ায় দু’টি দলই অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কাছে দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নতজানু হয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে দ্বিধা করে নাই। এসব দেন-দরবারের ফলে অবস্থা এমনই দাঁড়ায় যে রাজনীতিতে অতঃপর শুধু দুই নেত্রী ও দুই
দলের কর্তৃত্বই আরো জোরদার হয়ে ওঠেনি, একই সাথে দেশের ওপর সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদসহ দেশি-বিদেশি শাসক শ্রেণীর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণও এই সুযোগে আরো শক্ত হয়ে উঠতে পেরেছে।
এরকম পটভূমিতে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের ৫ বছরের দুঃশাসন এবং ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকারের ২ বছরের যন্ত্রণা, নির্যাতন ও নানা সন্দেহজনক কাজ-কর্মে অতিষ্ঠ হয়ে অধিকাংশ মানুষ ‘পরিবর্তনের’ জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ ও মহাজোট দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ডিজিটাল বাংলাদেশ ইত্যাদি জনপ্রিয় কিছু বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়ায় ভোটারদের বড় অংশের মধ্যে বিশাল আশাবাদ সৃষ্টি হয়। সংসদে আওয়ামী লীগ এককভাবে তিন-চতুর্থাংশ আসন ও মহাজোটগতভাবে চার-পঞ্চমাংশ আসনে জয়লাভ করে। ৭ বছর পর আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে।
বিপুল সংখ্যাধিক্যের কারণে সংসদে সাংবিধানিক শক্তির প্রায় একচেটিয়া ভিত্তি, জনগণের সমর্থন ও ইতিবাচক প্রত্যাশা ইত্যাদি অনুকূল পরিস্থিতি নতুন এই সরকারের সামনে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল ধারায় এগিয়ে নেয়ার বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিলো। কিন্তু সেই সুযোগ সরকার কাজে লাগায়নি। আর্থ-সামাজিক নীতি-আদর্শের ক্ষেত্রে এই সরকার সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর লুটেরা ধনবাদের ধারাতেই দেশ পরিচালনার পথ গ্রহণ করে। ফলে দেশের সংকট দূর করার ক্ষেত্রে কোনো মোড় পরিবর্তন ঘটানোর মতো অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। দেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনা যায়নি। ফলে দেশ ও জনগণের জীবনের সংকটগুলো অব্যাহতই রয়েছে।
বস্তুত আওয়ামী লীগ ’৭১-এ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিলেও, বর্তমানের আওয়ামী লীগ এখন আর ঠিক আগের মতো নেই। এই দলের শ্রেণী চরিত্র আমূল বদলে গেছে। এক সময় এই দলের নেতৃত্বে যেখানে মধ্য স্তরের (উকিল, শিক্ষক, কর্মচারী, ডাক্তার, ছোট ব্যবসায়ী ইত্যাদি) প্রাধান্য ছিল, সেখানে এখন প্রাধান্য লাভ করেছে লুটেরা ধনিক শ্রেণী ও বড় বুর্জোয়ার প্রভাব। এ রকম শ্রেণীর হাতে যে দলের নেতৃত্ব থাকে, সেই দল বা সেই দলের সরকার দ্বারা যথাযথভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারায় দেশকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাদের পক্ষে খুব বেশি হলে মৌলিক প্রশ্নে আপোস করে মুক্তিযুদ্ধের ধারার পোষাকি পুনর্বাসনের দ্বারা একদিকে শাসকশ্রেণীকে সন্তুষ্ট রাখা ও অন্যদিকে জনগণকে বিভ্রান্তিমূলক প্রবোধ দেয়া সম্ভব হতে পারে। সে চেষ্টাই সরকার করে চলেছে। এ বিষয়টি নির্বাচনের আগেই বোঝা গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অনেক কথা থাকলেও, ’৭২-এর সংবিধানের মূল ভিত্তি ও চার রাষ্ট্রীয় নীতি ফিরিয়ে এনে সেই অনুযায়ী দেশ পরিচালনার কথা সচেতনভাবেই বাদ রাখা হয়েছিল।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত ৫ম সংশোধনী বাতিল করে, বিশেষ বিবেচনায় কিছু ব্যতিক্রমী বিষয় বাদে, ‘৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রবর্তিত হলো’ বলে তার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে। ৩৮ নং ধারাটি, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে ’৭২-এর সংবিধানে যেভাবে ছিল, সেভাবেই তা সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে পুনঃপ্রবর্তিত হয়। এই রায়ের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সামনে ’৭২-এর সংবিধানের ধারায় দেশকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। ‘এই রায়ের ফলে এখন জামাতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল অবৈধ হয়ে গেছে’- বলে সে সম্পর্কে আইনমন্ত্রী ঘোষণা দেন। আওয়ামী লীগ সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ঐতিহাসিক সুযোগ কাজে না লাগিয়ে, বরং সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী এনে ’৭২-এর সংবিধানের কতগুলো মৌলিক ক্ষেত্রে পশ্চাদপসারণের পথ গ্রহণ করেছে। পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা ’৭২-এর সংবিধানের ৩৮নং ধারায় বয়ান পরিবর্তন করে জামাতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। সংবিধানের প্রারম্ভে জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘বিসমিল্লাহ...’ রেখে দেয়া হয়েছে। এরশাদ প্রবর্তিত ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’-এর বিধানটিও বহাল রাখা হয়েছে। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের বদলে উল্টা আদিবাসীসহ সব জাতিসত্তার জাতীয়তা ‘বাঙালি’ বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আরো বিপজ্জনক হলো, ‘বিসমিল্লাহ...’ ‘রাষ্ট্রধর্ম’, ‘আদিবাসীরাও সবাই বাঙালি’ ইত্যাদি বিষয়গুলো কখনই, এমনকি গণভোটের মাধ্যমেও পরিবর্তন করা যাবে না- এই মর্মে বিধান যুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
কোর্টের রায় মেনে নিয়ে, প্রয়োজন মতো ’৭২-এর সংবিধানের অসম্পূর্ণতা দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণের বদলে আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ প্রশ্নে মৌলিক ধরনের পশ্চাদাপসারণের পথ গ্রহণ করেছে। সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ ও তার সাথে সম্পৃক্ত বিধি-বিধান যাই থাকুক না কেন, দেশকে পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারায় পরিচালনার পথই সে অব্যাহত রেখেছে।
তাছাড়া সংবিধানে গুরুতর কিছু অগণতান্ত্রিক, অবিবেচনা প্রসূত, উগ্র জাতীয়তাবাদী ও নেতিবাচক ধারা যুক্ত করে ’৭২-এর সংবিধানের তুলনায় আওয়ামী লীগ পশ্চাদমুখী হয়েছে এবং নতুন কিছু গুরুতর সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি করেছে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটিও সংবিধান থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এই বিধানটি বাতিল করার কথা উচ্চ আদালতের রায়ে থাকলেও, রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থ রক্ষার যুক্তিতে একই রায়েই এই ব্যবস্থাটিকে আরো দুই মেয়াদ বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। রায়ের দ্বিতীয় অংশটিকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি উঠিয়ে দিয়েছে। কারো সাথে আগে আলোচনা না করে একেবারে শেষ মুহূর্তে আকস্মিকভাবে গ্রহণ করা এই পদক্ষেপের ফলে, রাজনীতিতে অচলাবস্থা ও গুরুতর সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একতরফা নির্বাচন করে বিজয় নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বিএনপিকে নির্বাচন বয়কট করতে বাধ্য করাতে এবং তার জায়গায় জাতীয় পার্টিকে গৃহপালিত বিরোধী দল সাজিয়ে মাঠে নামানোর রাজনৈতিক কূটচালের অংশ হিসেবে সরকার এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে অনেকেই মনে করেন। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিষয়টিকে অনিশ্চিত করে তোলা হয়েছে। সকলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি গ্রণযোগ্য নির্বাচন না করলে দেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা আরও বাড়বে। নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কোনো উদ্যোগ নেয় হয়নি। নির্বাচন এখন আরো বেশি করে অর্থশক্তি, পেশীশক্তি, প্রশাসনিক কারসাজি ইত্যাদির কাছে জিম্মি হয়ে পরেছে। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন সহ গোটা নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবিকে অগ্রাহ্য করে রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে এখনো পরিপূর্ণ স্বাধীন ও নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ববান করার ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
ক্ষমতা গ্রহণের বছর খানেক পার করে দিয়ে অবশেষে মহাজোট সরকার তার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অবশ্য বিচারকাজে অমনোযোগিতা, অদক্ষতা, গা-ছাড়া ঢিলেঢালা ভাব বিরাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। তথাপি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়াটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এই ইস্যুকে ভিত্তি করে স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে চূড়ান্তভাবে আঘাত করার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তা আওয়ামী লীগ সঠিকভাবে কাজে লাগায়নি। এমনকি প্রথম দু’বছর বিএনপি যেভাবে জামাতকে কিছুটা দূরত্বে রেখে চলছিলো, তার সুযোগও আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগ বরং জামাতসহ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বিএনপি’র সঙ্গ ছেড়ে আসার জন্য প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছে। জামাতসহ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সঙ্গীহীন করে তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টার বদলে সে বিএনপিকে বিচ্ছিন্ন ও সঙ্গীহীন করার মাধ্যমে তাকে আঘাতের মূল টার্গেট করার কৌশল নিয়ে এগিয়েছে। ক্ষমতার বিবেচনাকে আদর্শের বিবেচনার চেয়ে ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। ফলে স্বাধীনতাবিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার কাজটি কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার সম্ভাব্য বিপদ থেকে পার পেয়ে দু’বছর পর জামাত এখন বেশ জোরেসোরেই দেশে ও বিদেশে তৎপর হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। ইতোমধ্যে তারা আবার বিএনপি’র কাছাকাছি এসে পুনরায় মাঠে নামতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর নাগরিকবৃন্দের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ক্রমাগত কমে আসছে। সরকারের প্রশাসনিক কাজ-কর্মের ওপর সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের উপরতলার কর্তাদের নিয়ন্ত্রণ আরো বেড়েছে। বেড়েছে দলীয়করণ ও দলীয় হস্তক্ষেপ। সরকারের নীতি নির্ধারণ ও কাজ-কর্ম পরিচালনায় সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের প্রভাব বেড়েই চলেছে। সেখানে দুর্নীতি, ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, তদবির বাণিজ্য ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়ে চললেও, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধ বিপজ্জনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক যন্ত্রগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠলেও, তার জনকল্যাণমূলক কাজ দুর্বল হয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রের ভূমিকাকে কমিয়ে আনার নয়া-উদারবাদী নীতির সাথে তাল মিলিয়ে সমান্তরালভাবে এই অধোগতি ঘটে চলেছে। এই প্রবণতা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাতে লুটেরা ধনিকদের প্রভাব ও দাপট বৃদ্ধি করার পথ তৈরি করে দিচ্ছে।
মন্ত্রীসভাসহ সরকারের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-বেসামরিক আমলাদের উপস্থিতি ও প্রভাব আরো বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে জায়গা করে নিয়ে তাদের অনেকেই মন্ত্রণালয়ের প্রকৃত কর্তা হয়ে উঠেছে। একই সাথে লুটেরা ধনিক, বড় বুর্জোয়া ও বিত্তবানরাও এসব জায়গায় স্থান করে নিয়েছে। মধ্যস্তর থেকে আগত এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদও
এখন লুটপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ঢুকে পড়ে বড় বুর্জোয়ায় পরিণত হয়েছে। ফলে দেশের শাসন ক্ষমতার প্রত্যক্ষ পরিচালক হয়ে উঠেছে এক শ্রেণীর লুটেরা ধনিক ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-বেসামরিক আমলা। এমতাবস্থায় ক্ষমতার মিউজিকাল চেয়ারের খেলার জন্য বাছাইকৃত বড় দু’টি শক্তি, তথা আওয়ামী বলয় ও বিএনপি বলয়ের দলগুলোতে আদর্শগত রাজনীতির ধারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নিজ নিজ ‘আখের গুছানোর’ প্রতিযোগিতাসহ বৈষয়িক আত্মস্বার্থের বিষয়গুলো মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমগ্রভাবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এর ধাক্কা এসে লাগছে। বামপন্থী, প্রগতিবাদী, আদর্শবাদী, দেশপ্রেমিক, সৎ রাজনীতির ধারাকে এর ফলে প্রচন্ড প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই বিডিআর-এ ‘বিদ্রোহ’ এবং অর্ধশতাধিক সামরিক অফিসারের নির্মম হত্যাকা- সংগঠিত হয়। এই ঘটনার ফলে নানা ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতে মারাত্মক ধাক্কা এসে লাগে। যে বিপজ্জনক সংকটে দেশ নিপতিত হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও, এই ঘটনার রেশ এখনো সম্পূর্ণ মুছে যায় নি।
ক্ষমতায় আসার পর মহাজোট সরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করেছে। অবশিষ্ট মৃত্যুদ-প্রাপ্তরা বিদেশে অবস্থান করছে। তাদের ক্ষেত্রে রায় এখনো কার্যকর করা যায়নি। তাছাড়া ১৯৭৫ সালের হত্যাকান্ডের পেছনে যে গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র কার্যকর ছিল এবং বিদেশি ও দেশীয় যে সব শক্তি জড়িত ছিল, তার তথ্যও এখনো অনুসন্ধান ও উদঘাটন করা হয়নি। নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেও, আওয়ামী লীগ সরকার এ ক্ষেত্রে একেবারেই উল্টা পথে চলেছে। ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ সরকারের আমলে অপূর্ণাঙ্গভাবে হলেও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ক্ষমতা বাড়ানোর যে আইনগত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল, সেগুলোও বাতিল করে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বদলে কেন্দ্রীভবন ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড আরো বেশি করে রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এর সুযোগে আমলাতন্ত্রের উঁচু পদের কর্তাব্যক্তি, সংসদ সদস্যবৃন্দ প্রমুখ আরো বেশি করে তাদের স্বার্থ আদায় করে নিচ্ছে।
ক্ষমতার অধিকতর কেন্দ্রীভবনের এই ধারা বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোকেও গ্রাস করেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র সার্বিক নিয়ন্ত্রণ এখন আরো বেশি করে ও একচ্ছত্রভাবে এক ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। নেত্রীর বিরাগভাজন হওয়ার পরিণতি হলো দলীয় অবস্থান ও ভূমিকা পালন থেকে বাদ পড়ে যাওয়া। দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চালু ও দলের কার্যক্রমের ধারা সংস্কারের পক্ষে ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ সরকারের আমলে যারা অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ সে বিষয়ে আন্তরিক থাকলেও, তাদের অধিকাংশ ‘সংস্কারবাদী’ সেজেছিল ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ এজেন্ডায় শরিক থেকে ক্ষমতায় ভাগ বসানোর খায়েসে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে সেসব নেতৃবৃন্দকে এবার সরকার ও দলীয় নেতৃত্ব থেকে কার্যত বাদ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বিএনপি’র হালও একই রকম। গোটা সংস্কারবাদী অংশকে এখনো দলের বাইরে ফেলে রাখা হয়েছে।
৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের ফলে বিএনপি’তে ব্যাপক হতাশা ও মনোবল ভেঙ্গে পড়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। জামাতের সাথে সম্পর্ক বিএনপিকে যে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে, এ নিয়ে দলের ভেতরেই কথা ওঠে। সরকার দমন-পীড়ন, মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে নেতা-কর্মীদের নাজেহাল করে বিএনপিকে আরও দুর্বল করে ফেলার পথ গ্রহণ করে। কিন্তু সরকারের ব্যর্থতা ও নানা অপকর্মে মানুষ ক্রমাগত অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে থাকার সুযোগে, বিএনপি এই দমন-পীড়নকে সহানুভূতিমূলক সমর্থনে পরিণত করার চেষ্টা করে। নাজুক ও বেহাল অবস্থা কিছুটা দূর হতে শুরু করা মাত্র বিএনপি জোরোসোরে রাস্তায় নেমে পড়ে। জামাতের সাথে তার পুরনো ঐক্যকে সে আবার সক্রিয় করে তোলে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সে তার কিছুটা নমনীয় অবস্থান বদল করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুটি এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য সুযোগ করে দেয়। ইলিয়াস আলী ইস্যুসহ নানা ইস্যু তাদের মাঠে নামার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। সাম্রাজ্যবাদসহ প্রভাবশালী বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন পাওয়ার জন্য সে তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়।
আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়তা হারানোর ফলে যে শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা পূরণ করে ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য বিএনপি তার সব শক্তি নিয়ে এখন মাঠে নেমে পড়েছে। জামাতের সাথে পুরনো ঐক্য পুনঃস্থাপন করার পাশাপাশি জোট সম্প্রসারণ করে বিএনপি ১৮টি দলের (বেশির ভাগ ব্যক্তিকেন্দ্রিক নামসর্বস্ব দল) সমাবেশ গড়ে তুলেছে।
বিএনপি’র দক্ষিণপন্থী, প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক
চরিত্রের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, লুটপাটতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষায় সে যে আওয়ামী লীগের চেয়ে আরো দক্ষ ও পারদর্শী তা প্রমাণের মাধ্যমে সে দেশি-বিদেশি শাসকশ্রেণীর মদদ পাওয়ার চেষ্টা করছে। জনগণ আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে শুরু করলেও, বিএনপি’র পেছনে উৎসাহ নিয়ে সমবেত হচ্ছে না। কারণ সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ‘হাওয়া ভবনের’ দুরাচার, বাংলা ভাইয়ের ও জেএমবি’র প্রতি সমর্থন, অস্ত্র আটকের ঘটনা, গ্রেনেড হামলা, সিরিজ বোমা হামলা, ভূয়া ভোটার তালিকা, খাম্বা কেলেঙ্কারি, তেল-গ্যাস প্রাকৃতিক সম্পদ বিদেশে পাচার ইত্যাদি বিএনপি-জামাতের দুঃশাসনের সময়কালের স্মৃতি এখনো মানুষ ভুলে নাই। মানুষ আওয়ামী লীগের শাসন পছন্দ করছে না। কিন্তু বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় ফিরে আসুক, সেটাও তারা চায় না। এই দুই শক্তির বাইরে একটি বিকল্প সৎ-প্রগতিশীল সরকার তারা চায়। কিন্তু তাদের সামনে সে ধরনের শক্তি এখনো তারা প্রত্যক্ষ করতে পারছে না।
রাজনৈতিক শক্তি-সমাবেশের ক্ষেত্রে বিরাজমান এই অবস্থায় একটি মহল দেশি-বিদেশি শাসক-শোষকদের স্বার্থ রক্ষার্থে সেনাবাহিনীর মদদে ‘সুশীল সমাজ’, সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী, সুযোগ সন্ধানী রাজনীতিক প্রমুখের সমন্বয়ে ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ কায়দায় একটি ‘অরাজনৈতিক’ সরকারকে ক্ষমতায় নিয়ে আসতে চায়। এই উদ্দেশ্যে রুগ্ণ রাজনীতিকে আক্রমণ ও সৎ রাজনীতিকে মদদ দেয়ার বদলে ঢালাওভাবে ‘রাজনীতিকেই’ দেশের দুর্দশার জন্য অভিযুক্ত করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তাদের পরিকল্পিত পথ হলো, গণতান্ত্রিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে, জনগণকে মুখ বন্ধ করে ঘরে বন্দি করে রেখে এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বাদ দিয়ে দেশ পরিচালনা করা। প্রয়োজন ও সুযোগ মতো যেন সেই পথে দেশকে নিয়ে যাওয়া যায়, সেজন্য ষড়যন্ত্রের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করে রাখা হয়েছে।
দেশের জন্য জামাতসহ সাম্প্রদায়িক, ফ্যাসিস্ট-জঙ্গি শক্তিগুলোই হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক। দেশের গণতান্ত্রিক শক্তির সুবিধাবাদী চরিত্র, দুর্বলতা-ব্যর্থতার সুযোগে তারা এখন বাস্তব বিপদে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের একেবারে গোড়াতেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার জামাতকে মূল টার্গেট করে আঘাত না করায়, এ ক্ষেত্রে বড় একটি রাজনৈতিক সুযোগ নষ্ট হয়েছে। জামাত আবার বিএনপি’র কাঁধে ভর করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জামাতকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার কাজ বর্তমানে আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। তারা এখন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য গোপন ও প্রকাশ্য তৎপরতা বাড়িয়েছে। মাঝে মধ্যে পেশী শক্তিও প্রদর্শন করছে। অন্তর্ঘাত, কমান্ডো কায়দায় হামলা ইত্যাদি কাজও তারা পরিচালনা করছে। তৃণমূলে সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা সম্পর্কে এবং অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক, প্রগতিশীল আদর্শগত রাজনৈতিক প্রচারণার কাজে ক্ষমাহীন অবহেলার সুযোগ নিয়ে জামাতসহ সাম্প্রদায়িক শক্তি এক বিপজ্জনক অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জনপ্রিয় দাবির মুখে তারা কোণঠাসা হওয়া সত্ত্বেও, এই সুযোগকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না।
দেশের রাজনৈতিক সংকট হলো সামগ্রিক অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থারই স্বাভাবিক ফলশ্রুতি। পরিস্থিতির দাবি হলো, গোটা অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। এই মৌলিক কর্তব্যের বিষয়টি জনগণের কাছে ক্রমেই আরো স্পষ্ট হচ্ছে। দু’টি বুর্জোয়া দলের হাতে দেশের সরকার ও রাজনীতি আজ বন্দী থাকার ফলে যে অনাচার, লুটপাট, দুর্যোগের বেড়াজালে দেশ ও জনগণ আরো বেশি করে নিমজ্জিত হচ্ছে, সেই অবস্থা মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এই দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য মানুষ উদগ্রীব হয়ে আছে। কিন্তু কাদের দ্বারা তাদের প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে, এমন শক্তি তারা চোখের সামনে দেখতে পারছে না।
যে বামপন্থী শক্তির দ্বারা মানুষের সামনে বিকল্প তুলে ধরা সম্ভব, তারা এখনো তাদের সেই কর্তব্য পালন করতে পারছে না। নানা পর্যায়ক্রমিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ সত্ত্বেও, বামপন্থী শক্তির মধ্যে এখনো কোনো ঐক্যের কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। তাদের অধিকাংশেরই প্রভাব ও জমায়েত ক্ষমতা দুর্বল। তাছাড়া অনেকেরই রয়েছে নানা বিষয়ে ত্রুটি, বিচ্যুতি, বিভ্রান্তি। একটি অংশ এখনো মহাজোটে অন্তর্ভুক্ত থাকায়, তারা বস্তুত সরকারের অংশ হয়ে আছে। অন্যদিকে কেউ কেউ আবার বাম সংকীর্ণতা, বিপ্লবী বাক্যবাগীশতা, জনবিচ্ছিন্নতা ও বিমূর্ত তত্ত্বায়নের জগতে আবদ্ধ থাকা প্রভৃতি দুর্বলতায় আক্রান্ত। বামপন্থীদের মধ্যে সিপিবি সবচেয়ে বড় শক্তি হলেও, এদেরকে মোটামুটি একটি সঠিক ধারায় নিয়ে এসে ঐক্যবদ্ধ সমাবেশ নিশ্চিত করার মতো যে শক্তি-সামর্থ্য দরকার, এককভাবে
তা সিপিবি’র এখনো নেই। তাছাড়া বামপন্থী শক্তির বাইরে, তাদের সাথে মিলিত হয়ে বাম-গণতান্ত্রিক শক্তি-সমাবেশ গড়ে তুলতে পারে, তেমন প্রভাব সম্পন্ন বড় কোনো প্রগতিবাদী, দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক সৎ রাজনৈতিক শক্তি এখনো দৃশ্যমান নয়। ফলে দেশবাসীর প্রত্যাশিত বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এটাই এখন দেশের রাজনীতির মূল সমস্যা। অথচ এই অভাব পূরণ ব্যতীত সংকট থেকে উত্তরণের পথ নেই।
রাজনৈতিক কর্তব্য
সাম্প্রতিক সময়কালসহ ’৭৫ সাল পরবর্তী কালপর্ব ধরে চলতে থাকা সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা ধনিক শ্রেণীর শাসন এবং তাদের চাপিয়ে দেয়া মুক্তবাজার নীতি, পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন, উদারীকরণ, নির্বিচার বিরাষ্ট্রীয়করণ, বি-নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি আমাদের অর্থনীতিতে লুটপাট, পরনির্ভরতা ও অবক্ষয়ের জন্ম দিয়েছে। উৎপাদনবিমুখ, কমিশনভোগী, পরগাছা ও লুম্পেন চরিত্রের দেশীয় শাসকগোষ্ঠী, সাম্রাজ্যবাদ ও বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ রক্ষার বিনিময়ে দেশের ধন-সম্পদ অবাধে লুটপাট করার, অর্থনীতির স্বাধীন ও স্থিতিশীল বিকাশ রুদ্ধ করার এবং দেশবাসীর জীবন-জীবিকাকে সার্বিকভাবে বিপর্যয়ে নিক্ষেপ করার এক সংকটাপন্ন আবর্ত রচনা করেছে।
দেশি-বিদেশি শাসক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী বুর্জোয়া ধারার রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার গঠন করলেও, তারা কেউ এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন করেনি এবং দেশবাসীর ভাগ্যের কোনো গুণগত মৌলিক উন্নয়নও তারা ঘটাতে সক্ষম হয়নি। শোষকশ্রেণী তাদের শোষণ অব্যাহত ও নিরঙ্কুশ করার উদ্দেশ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে ভিত্তি করে দ্বি-দলীয় মেরুকরণের কাঠামোতে রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতার কর্তৃত্বকে বেঁধে রাখার জন্য নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছে এবং একই সাথে সাম্প্রদায়িক জামাত ও তার সহযাত্রী উগ্র জঙ্গি গোষ্ঠীকে লালন করেছে। কিন্তু দ্বি-দলীয় মেরুকরণভিত্তিক রাজনীতির ফর্মুলা দিয়ে স্থিতাবস্থা নির্বিঘ্ন করার তাদের সেই প্রয়াস দেশ ও জনগণের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। কিন্তু রাজনীতিতে প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা আসেনি। বরং চরম নৈরাজ্য, অব্যাহত সংঘাত ও বেপরোয়া লুটপাটের ফলে তা শোষক শ্রেণীর জন্য কখনো কখনো সমস্যা ও বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে। দেশি-বিদেশি শাসকশ্রেণী সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে লঙ্ঘন করে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে সেনাবাহিনী, ‘সুশীল সমাজ’ প্রভৃতির সমন্বয়ে সরকার গঠন করেও, সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারেনি। সংকট পরিস্থিতি বরং গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। অভিজ্ঞতা এ কথাই বলে যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শক্তির শ্রেণীগত চরিত্র বদল না হলে এবং অর্থনৈতিক-সামাজিক নীতি-দর্শনের প্রগতিমুখী মৌলিক পরিবর্তন না ঘটলে সংকট নিরসন হবে না। সংকটের চেহারা, রূপ ও পরিমাণের কিছু হেরফের হবে মাত্র।
রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে যে পচন ও অবক্ষয় দেখা দিয়েছে, সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে সেই সংকট নিরসন করা যাবে না। বুর্জোয়া রাজনীতির বেড়াজাল ভেঙ্গে বামপন্থীদের নেতৃত্বে বিকল্প রাজনৈতিক ও গণশক্তির সচেতন সংগঠিত উত্থান ছাড়া বর্তমান দুঃসহ অবস্থার মৌলিক ও স্থায়ী কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাছাড়া বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি সুষ্পষ্টভাবে একথাও প্রমাণ করছে যে, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী বিশ্বায়নই আজ সকল জাতির ও মানব সমাজের দুর্দশার মূল কারণ এবং একমাত্র সমাজতন্ত্রের পথ ধরেই এই সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব। কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের সামনে আজ বিপ্লবী রূপান্তর সাধনের সেই সুবিশাল কঠিন দায়িত্ব উপস্থিত হয়েছে।
বর্তমান সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সাধন করতে হবে। অন্য কাজ আগে সম্পন্ন করার জন্য এই মূল কর্তব্যকে পেন্ডিং না রেখে, তাকে সব সময়ের মূল কাজ হিসেবে গণ্য করতে হবে। অপরাপর সব আশু ও জরুরি কাজের মাঝে এই বিষয়টিকেই কেন্দ্রীয় কর্তব্য বলে বিবেচনা করে সেই মোতাবেক পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত চারটি কাজকে গুরুত্বের সাথে এগিয়ে নিতে হবে :
১. বুর্জোয়া ধারার শক্তি-সমাবেশের বাইরে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের মতো সামর্থ্য ও যোগ্যতা সম্পন্ন এবং জনগণের আস্থাভাজন বিকল্প বাম-প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক শক্তি-সমাবেশ গড়ে তোলা।
২. দেশবাসীর সামনে জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকারী, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, গণমুখী, প্রগতিশীল বিকল্প কর্মসূচি উত্থাপন ও তা জনপ্রিয় করে তোলা।
৩. শ্রমজীবী মানুষসহ ব্যাপক জনগণের শ্রেণীগত ও অন্যান্য ন্যায্য দাবির ভিত্তিতে পরিচালিত গণসংগ্রামের ধারায় তাদেরকে সচেতন ও সংগঠিত করে রাজনীতি ও সমাজে বর্তমান শাসক-শোষক শ্রেণীর আধিপত্য
খর্ব করে পূর্বোক্ত বিকল্প শ্রেণী শক্তির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা।
৪. সাম্প্রদায়িকতা, সশস্ত্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপদ, রাষ্ট্রের ফ্যাসিস্ট প্রবণতা, গণতান্ত্রিক অধিকার সঙ্কুচিত করার চেষ্টা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টা প্রভৃতিকে বড় বিপদ বলে বিবেচনা করে তার বিরুদ্ধে সংগ্রামে আপোসহীন, দায়িত্বপূর্ণ ও অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করা।
এসব মৌলিক কাজ অগ্রসর করার জন্য আমাদের পার্টিকে প্রধান উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। একথা মনে রেখে নিম্নলিখিত কাজগুলো গুরুত্বসহ অগ্রসর করতে হবে :
ক. কমিউনিস্ট পার্টির শক্তি, সামর্থ্য ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, দেশের সবচেয়ে পরীক্ষিত ও দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ পার্টি হিসেবে সিপিবি’র দায়িত্ব অনেক। সেজন্য পার্টিকে সত্যিকার বিপ্লব ও শ্রেণী সংগ্রামের পার্টি, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের পার্টি, গণভিত্তিসম্পন্ন পার্টি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সমাজের সর্বস্তরে সর্বমহলে পার্টির যোগাযোগ ও ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিক্রিয়াশীল সন্ত্রাসী হামলা বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস মোকাবেলায় সক্ষম, নানা জটিল ও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ধারাবাহিক কাজ এগিয়ে নিতে পারদর্শী, মানুষের সুখে-দুখে তার পাশে থেকে জঙ্গি গণসংগ্রাম ও একই সাথে নানা ইতিবাচক গঠনমূলক কাজ এগিয়ে নিতে সামর্থ্যবান একটি বিপ্লবী সংগঠন হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টিকে গড়ে তুলতে হবে। পার্টিকে আরো বেশি দৃঢ়তা-সাহস-ঝুঁকি, আরো বেশি শক্তি ও নমনীয়তা নিয়ে সমাজের সমস্ত বিপ্লবী শক্তি ও উপাদানের উন্মেষ ঘটানোর জন্য সচেষ্ট হতে হবে। নির্বাচনী সংগ্রাম চালাতে হলে, সে জন্যও পার্টিকে দক্ষ ও উপযুক্ত করে তুলতে হবে।
খ. শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর, নারী, আদিবাসী, ছাত্র, যুবক, সাংস্কৃতিক কর্মী, বস্তিবাসী, সাংবাদিক, আইনজীবী প্রভৃতি অংশের মানুষের প্রগতিশীল গণসংগঠনের কাজের মাত্রা, পরিধি ও দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং নানা পন্থায় জনগণের মধ্যে কাজ এবং গণআন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা জোরদার করতে হবে।
গ. অপরাপর কমিউনিস্ট দল ও শক্তির সাথে ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে ও ধৈর্যের সাথে কাজ করে যেতে হবে। কমিউনিস্ট ঐক্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি হলে, তাকে কাজে লাগাতে হবে। একই সাথে তাদেরকে নিয়ে গণসংগঠনের ঐক্য গড়ে তোলা এবং সম্ভব মতো ঐক্যবদ্ধ গণসংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টাও চালাতে হবে।
ঘ. অপরাপর বামপন্থী শক্তি এবং একই সাথে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তিকেও ঐক্যের ধারায় টেনে আনার চেষ্টা করতে হবে। একথা মনে রাখতে হবে যে, বাম-গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যের প্রক্রিয়া সহজ-সরল নয়। নানা ভাঙ্গা-গড়ার মধ্য দিয়েই তাকে সৃজনশীলতাভাবে ও ধৈর্যের সাথে এগিয়ে নিতে হবে। এক্ষেত্রে যুগপৎ ও সমন্বিত ধারায় কাজ করার মাধ্যমেও ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে হবে। নানা পদ্ধতি ও ফর্মে বৃহত্তর বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে সমঝোতা, সমন্বয় ও ঐক্য গড়ে তোলার কাজকে ধৈর্যের সাথে এগিয়ে নিতে হবে।
ঙ. সহযোগী বামপন্থী, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক দল ও শক্তির দোদুল্যমানতা, সুবিধাবাদ, বাক্যবাগীশতা, প্রদর্শনবাদ, হঠকারিতা, সঙ্কীর্ণতা প্রভৃতি বিচ্যুতির বিরুদ্ধে ধৈর্যের সাথে সংগ্রাম করার পাশাপাশি, সকলকে তৃণমূলে প্রকৃত শ্রেণী সংগ্রাম ও গণসংগ্রামের কাজে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করার চেষ্টা করতে হবে।
বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ার মূল কর্তব্যের সাথে সাথে ফ্যাসিস্ট সশস্ত্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপদ মোকাবেলা, সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাভূত করা, ফ্যাসিস্ট প্রবণতা রুখে দাঁড়ানো, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা ও প্রসারিত করা ইত্যাদি কাজগুলোও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম জোরদার করা বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্তব্য। আগেই বলা হয়েছে যে, এসব ইস্যুতে কমিউনিস্ট ও বামপন্থী শক্তিকে স্বাধীনভাবে সংগ্রামের অগ্রভাগে থেকে লড়াই করতে হবে। তাছাড়াও এসব ইস্যুতে সম্ভাব্য ব্যাপকতম শক্তিকে সাথে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজনে অপরাপর গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক শক্তি বা শক্তি সমাবেশের সাথে নির্দিষ্ট ইস্যুতে, পরস্পরের স্বাধীন অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখে, সমান্তরাল, সম-অভিমুখী, যুগপৎ পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্যোগী হতে হবে।
দেশে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সূচনার আগেও, রাজনৈতিক ক্ষমতার নানা উত্থান-পতন ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রশ্নে তার অভিঘাত কী হতে পারে, সেই মানদন্ডের বিবেচনা থেকে এইসব রাজনৈতিক
পর্ব সম্পর্কে মূল্যায়ন করে উপযুক্ত কর্মকৌশল গ্রহণ করতে হবে। এসব পরিবর্তনের মুখে স্বাধীন নীতিনিষ্ঠ অবস্থান বজায় রেখে মূর্ত-সৃজনশীল কায়দায় এমন কৌশলই কমিউনিস্ট পার্টিকে গ্রহণ করতে হবে, যাতে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের দিকে যাত্রা অব্যাহত ও ত্বরান্বিত হয়। এক্ষেত্রে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হয় বা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ণ হয়, শাসকগোষ্ঠীর এ ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।
বর্তমানে দেশে যে শক্তি ভারসাম্য বিদ্যমান তা বিবেচনায় রেখে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বলয়ের বাইরে বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্পের সম্ভাব্য শক্তি ছাড়াও দেশপ্রেমিক, উদারনৈতিক, সৎ ও জনপ্রিয় শক্তি ও ব্যক্তিকে নিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য বৃহত্তর বিকল্প শক্তি বলয় গড়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
দেশের বর্তমান ক্রান্তিকালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষসহ দেশবাসীকে সাম্রাজ্যবাদ, লুটেরা ধনিক, লুটপাটতন্ত্র, কায়েমী স্বার্থের ধারক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি, সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠী, সাম্প্রদায়িতকতা ও স্বৈরাচারী প্রবণতা ও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে।
Login to comment..