সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জাতীয় সমাবেশ থেকে সিপিবি-বাসদ-এর আহ্বান
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনুন
Posted: 27 ফেব্রুয়ারী, 2015
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, দেশকে সংকটমুক্ত করে সততা-দেশপ্রেম-আদর্শবাদের ধারায় জাতির অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য, সিপিবি-বাসদ-এর নেতৃত্বে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। সেই লক্ষ্যে গ্রামে-শহরে-বন্দরে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ ও সমবেত হয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর জাতীয় সমাবেশে সভাপতির ভাষণে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এসব কথা বলেন। কমরেড সেলিম ছাড়া আরো বক্তব্য রাখেন বাসদ-এর সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ, বাসদ-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশিদ ফিরোজ। সমাবেশটি পরিচালনা করেন সিপিবি নেতা কাফি রতন ও বাসদ নেতা রাজেকুজ্জামান রতন।
কমরেড সেলিম বলেন, দেশবাসী আওয়ামী বলয় ও বিএনপি বলয়ের রাজনীতি কয়েক যুগ ধরে দেখছে। জোট ও মহাজোটের দ্বি-দলীয় কাঠামোতে দেশ আজ যেভাবে আবদ্ধ হয়ে আছে, তা গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বদলে দেশকে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য-অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছে। এই সুযোগে জামায়াত-শিবিরের নেতৃত্বে স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক জঙ্গী শক্তি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের নীলনকশা কার্যকর করতে সক্ষম হচ্ছে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে ক্ষুণ্ণ করার ষড়যন্ত্রও চলছে। বিএনপি জামায়াতকে জোটসঙ্গী করেছে। আওয়ামী লীগ জামায়াতকে প্রধান শত্রু হিসেবে গণ্য করে চলার বদলে ক্ষমতার প্রতিযোগী বিএনপিকে কাবু করার কাজকে প্রাধান্য দিচ্ছে। জামায়াতের অর্থ-শক্তি, পরিচালনা কেন্দ্র, যোগাযোগ-নেটওয়ার্ক, ক্যাডার-কাঠামো ইত্যাদি নিশ্চিহ্ন করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে হবে এবং আওয়ামী লীগকে জামায়াত নিষিদ্ধ করতে হবে। তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লেখক অভিজিৎ রায়ের খুনীদের গ্রেফতারের দাবি জানান।
কমরেড সেলিম আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ধারায় দেশ পরিচালনা করতে হলে, বর্তমানে দেশের প্রধান বিপদ সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িক জঙ্গীবাদ ও লুটপাটতন্ত্রের কবল থেকে দেশকে উদ্ধার করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের দুশমন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে তোষামোদ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা করা যায় না। দুর্নীতি-লুটপাট চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তিনি সর্বত্র ‘দুর্নীতি-লুটপাট বিরোধী গণকমিটি’ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
কমরেড সেলিম আরো বলেন, আন্দোলন করার অধিকার থাকলেও, পেট্রোল বোমায় মানুষ হত্যার অধিকার খালেদা জিয়ার অথবা অন্য কারো নেই। এই নৃশংসতা বন্ধ করতে হবে। ক্রসফায়ার, বন্দুক যুদ্ধ ও গুম-খুন করে সহিংসতা বন্ধ করা যায় না। ‘আগুন দিয়ে আগুন নিভানো যায় না’-এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সেই ভ্রান্ত পথ ত্যাগ করে ‘আলো দিয়ে আলো ছড়ানোর’ পথ গ্রহণের জন্য তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
কমরেড সেলিম বলেন, গণতন্ত্রকে দৃঢ়মূল করার জন্য দেশের বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থাকে টাকার খেলা, পেশীশক্তির দাপট, প্রশাসনিক কারসাজি, সাম্প্রদায়িক প্রচারণা থেকে মুক্ত করতে হবে। নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা’ চালু করতে হবে। স্থানীয় সরকারকে আর্থিক কর্তৃত্বসহ পূর্ণ ক্ষমতায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব বিষয়ে দেশের সব গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে আলোচনা ও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আহ্বান জানান। এরশাদ স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের তিন জোটে শরিক শক্তিগুলোকে তিনি বৈঠকে বসার আহ্বান জানান।
জাতীয় সমাবেশে বাসদ-এর সাধারণ খালেকুজ্জামান বলেন, ক্ষমতা দখলে রাখা এবং ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে দুই প্রধান বুর্জোয়া দল ও তাদের জোট চরম সংঘাত-সহিংতায় লিপ্ত রয়েছে। সারা দেশের মানুষ জিম্মিদশায় পতিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়ে, আগুনে পুড়ে, গুলিবিদ্ধ হয়ে আজ নিয়ে ৫৩ দিনে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েক হাজার আহত ও পঙ্গু হয়েছে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত, দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমিক-মজুরদের জীবন বিপন্ন, কৃষক ফসলের মূল্য না পেয়ে বিপর্যস্ত। বাঁচার তাগিদে নিত্য ঘর থেকে বেরোতে বাধ্য জনগণ ক্ষুধার আগুনে একদিকে জ্বলছে অন্যদিকে পেট্রোল বোমার আগুনে-গুলিতে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে। কিন্তু উভয় পক্ষই বর্তমান সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে তাদের ক্ষমতায় থাকা ও যাওয়ার উন্মত্ততা ও সহিংস লড়াইয়ের মাধ্যমে ফয়সালাকে শিরোধার্য করে নিয়েছে। মানুষের দুর্ভোগ-দুর্দশার ভয়াল চিত্র তাদের অপরাজনীতির পুঁজিতে পরিণত হয়েছে।
কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, দুই দল-জোটের ক্ষমতার লড়াই-এ যেই জিতুক, হারবে জনগণ; মরবে গণতান্ত্রিক চেতনা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ। বুর্জোয়া রাজনীতির এ নির্মম পরিহাস থেকে উত্তরণের জন্য দ্বি-দলীয় বৃত্তের বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি নির্মাণের যে আহ্বান রেখেছি, তার যথার্থতা যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট।
তিনি আরো বলেন, বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বা শক্তিসমূহের দ্বারা উদ্ভাবিত কথিত সমাধান রূপকল্প যা একটা স্বাধীন দেশের জন্য অমর্যাদাকর, সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ যা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং গণতন্ত্রের জন্য হানিকর, মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান যা আলকায়েদা-আইসিস-এর গণতন্ত্র ও সভ্যতা বিরোধী চিত্র হাজির করে। আমরা দেশবাসীর কাছে আবারও আহ্বান জানাই, যত দ্রুত শ্বাসরোধ করা অবস্থান থেকে পরিত্রাণ চান তত দ্রুত বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি-সমাবেশের জন্য এগিয়ে আসুন। সিপিবি-বাসদ-কে শক্তিশালী করুন।
সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ বলেন, দেশে এক অস্বাভাবিক, আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে গ্রাম ও শহরের গরিব মানুষ, উৎপাদনকারী কৃষক। মানুষ এই অবস্থার অবসান চায়- মানুষ বাঁচতে চায়। আগুন নেভাতে হবে। বার্ন ইউনিটের কান্না থামাতে হবে। তার জন্য দরকার প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং তার পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্যোগ। প্রশাসনিক পদক্ষেপের নামে চলছে গ্রেফতার বাণিজ্য-সার্টিফিকেট বাণিজ্য। পুলিশ জামাত-শিবিরকে গ্রেফতার করলে সরকারি দলের অনেক নেতা টাকার বিনিময়ে শিবিরকে ‘মেধাবী ও দেশপ্রেমিক’ সার্টিফিকেট দিয়ে ছড়িয়ে আনছেন। গুম-খুন-বিচার বহিভূর্ত হত্যাকান্ড আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। আন্দোলনের নামে সহিংসতা, নাশকতা বন্ধ করার পাশাপাশি গ্রেফতার বাণিজ্য, গুম-খুন-ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধেও গর্জে উঠতে হবে।
কমরেড জাফর আরো বলেন, আমরা ২০১৩ সালে সরকারপন্থীরা বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ রক্ষা করতে গণতন্ত্র বাদ দিতে হবে। এখন তারা বলছেন, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একসাথে চলবে না। আমরা পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের চার নীতির এক নীতি গণতন্ত্র বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হয় না। গণতন্ত্র ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে যা হবে তা হচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধ বাণিজ্য’, বর্তমান শাসক দল যা করছেন। আর গণতন্ত্র ছাড়া উন্নয়ন মানে লুটপাট। উন্নয়নের নামে এখন চলছে লুটপাট। উন্নয়নের নামে ব্যাংকের টাকা হরিলুট হয়ে যাচ্ছে। হলমার্ক ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, পদ্মা সেতু, শেয়ার মার্কেটের কেলেংকারি আমরা জানি। জনতা ব্যাংকের টাকার হদিস নাই, কৃষি ব্যাংকের টাকার হদিস নেই, বেসিক ব্যাংকের টাকার হদিস নেই।
তিনি আরো বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতার লড়াইয়ে কতশত সাধারণ মানুষ জীবন দিয়েছে তার হিসাব কে রাখে। আমরা এই বুর্জোয়া দুই দলের ক্ষমতার লড়াইয়ে বলি হতে চাই না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রহসনমূলক, একতরফা, অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ফল বর্তমান সরকার। বর্তমান সংকটের শুরু সেখান থেকেই। জামাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির প্রক্রিয়া বানচালের উদ্দেশ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। বিএনপি তাদের জোটসঙ্গী করেছে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষেত্রবিশেষে জামাতকে নিজের দিকে রাখার চেষ্টা করছে। বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগে বিদেশিরা তাদের স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টায় মেতে উঠেছে। আজকের এই সহিংস পরিস্থিতি ও সংঘাতের রাজনীতি যদি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়- তাতে লাভ হবে উগ্র জঙ্গিবাদী গোষ্ঠির। রাজনৈতিক সংকট রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। বামপন্থীদের সাহসে বুক বেঁধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, সভা-সমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ গণতান্ত্রিক-মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, সরকারি দমন-পীড়ন-নির্যাতন বন্ধ, জামাত-শিবির নিষিদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে সোচ্চার হতে হবে। সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন চালুসহ নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার, শ্রমিকের ন্যায়সঙ্গত মজুরি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, ছাত্রদের শিক্ষার অধিকার, নারীর মর্যাদাপূর্ণ জীবন, জনগণের চিকিৎসা সেবা ও বাসস্থান পাওয়ার অধিকার, সম্প্রচার মাধ্যম ও সাংস্কৃতিক কর্মীর স্বাধীনতা-নিরাপত্তাসহ গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ার আন্দোলন শক্তিশালী করতে হবে।
জাতীয় সমাবেশ থেকে নিম্নোক্ত কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
১লা মার্চ : দেশব্যাপী স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের বীর শহীদ কমরেড তাজুল ইসলাম স্মরণে যথাযথ মর্যাদায় ‘তাজুল দিবস’ পালন।
২ মার্চ থেকে ৮ মার্চ : সারা দেশে জেলায় ও উপজেলায় সমাবেশ ও গণমিছিল।
জাতীয় সমাবেশ শেষে একটি গণমিছিল ঢাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
বার্তা প্রেরক
কেন্দ্রীয় দপ্তর বিভাগ