আজীবন বিপ্লবী, ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামী, শ্রমিক- শিক্ষক-নারী আন্দোলনের অন্যতম নেতা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য, কমরেড হেনা দাসের শততম জন্মদিন আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। কমরেড হেনা দাসের জন্মশতবার্ষিকীতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড রুহিন হোসেন প্রিন্স এক বিবৃতিতে কমরেড হেনা দাসের বিপ্লবী স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, আজীবন শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির লড়াই করে গেছেন।
নেতৃবৃন্দ বলেন, মানবমুক্তির মহান সংগ্রামে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অবিচল ছিলেন বিপ্লবী কমরেড হেনা দাস। মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ তথা সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত নিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে কমরেড হেনা দাস সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। তিনি ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসন-শোষণের শৃঙ্খল ছিন্ন করে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে তিনি ছিলেন অগ্রসৈনিক। কমরেড হেনা দাসের মতো বহুমুখী ধারার আন্দোলনের অনন্য নেত্রী এদেশে খুবই কম জন্মেছেন। এদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছেন কমরেড হেনা দাস। ১৪ বছর বয়স থেকে আমৃত্যু বহুমুখী সংগ্রামে তিনি ছিলেন অনন্য।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ হেনা দাসের আদর্শকে ধারণ করে এ দেশের নিপীড়ত-মেহনতি মানুষের এবং নারী সমাজের শোষণ মুক্তির লড়াইকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান এবং প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
কর্মসূচিকমরেড হেনা দাসের জন্মশতবার্ষিকীতে আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সোমবার, বেলা ১২টায় পুরানা পল্টনস্থ সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তাঁর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন ও জন্মশতবার্ষিকীর কার্যক্রম শুরু হবে।
এছাড়াও সকাল ১০টায় নারায়ণগঞ্জে কমরেড হেনা দাসের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে।
কমরেড হেনা দাস এর জন্মশতবার্ষিকীতে বছরব্যাপী কেন্দ্রসহ বিভিন্ন জেলা, উপজেলা কমিটি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করা হবে।
কমরেড হেনা দাসের সংক্ষিপ্ত জীবনীকমরেড হেনা দাস ১৯২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত বিপ্লবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হাইস্কুল পার হবার আগেই কমরেড হেনা দাস স্থানীয় বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য ত্রিশ দশক ছিল বিক্ষোভ, আন্দোলন ও বিদ্রোহের সূচনাকাল। হেনা দাসের বাড়ি ছিল সিলেট শহরের কেন্দ্রস্থল পুরানলেন পাড়ায়। বাড়ির কাছে ঐতিহাসিক গোবিন্দ পার্ক ছিল মূলত সমাবেশের কেন্দ্র। ফলে তিনি কাছ থেকে স্লোগান, মিছিল ও সভা-সমাবেশ দেখেছেন। দেখেছেন স্বদেশিদের ওপর বর্বর পুলিশি নির্যাতন। যার ফলে হেনা দাসের মনে ধীরে ধীরে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জন্ম নেয় এবং কৈশোর থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।
১৯৪০ সালে সরকারি অগ্রগামী বালিকা বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ভর্তি হন সিলেট মহিলা কলেজে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। হেনা দাস কলেজের সহপাঠীদের সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় জনরক্ষা কমিটি গঠনের কাজে অংশ নেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রচারের পাশাপাশি পাড়া কমিটির মাধ্যমে আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনেও তিনি অংশগ্রহণ করেন।
কলেজে পড়ার সময়ই তিনি জড়িয়ে পড়েন সেসময় নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। তখন গোপনে পার্টির কাজ করতে থাকেন এবং পার্টির বিভিন্ন কাগজপত্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিলি করেন। এসব করতে করতেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেয়ে যান।
১৯৪৫ সালে কমরেড হেনা দাস মৌলভীবাজার জেলায় ভানুবিলে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গঠন করেন। এই সমিতি বিভিন্ন সভা ও আলোচনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নারী সমাজে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করে।
১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত ‘নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলন’-এ লক্ষাধিক সংগ্রামী জনতার সাথে ‘গণনাট্য সংঘ’র শিল্পী হিসেবে কৃষক আন্দোলনে সামিল হন।
১৯৪৮-৪৯ সালে নানকার আন্দোলনে নানকার নারীদের সংগঠিত করেন কমরেড হেনা দাস। তারপর তিনি চলে যান চা বাগানে। সেখানে কুলি রমণীর ছদ্মবেশে নারীদের ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলেন।
চল্লিশের দশকে হেনা দাস আসামের কমিউনিস্ট প্রতিনিধি হিসেবে বোম্বে যান। সেখানে সর্বভারতীয় ছাত্র-কমিউনিস্টদের ২০ দিনব্যাপী এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যোগ দেন। তখন তিনিসহ মোট চারজন নারী প্রতিনিধি ওই কর্মসূচিতে যোগ দেন।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে কমরেড হেনা দাস শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন।
এই সমিতির পক্ষে তিনি ভারতে ৫০টি শরণার্থী শিবিরে শিশুদের জন্য বিদ্যালয় খুলেন। কমরেড হেনা দাস ওই বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। আবার শুরু করেন শিক্ষকতা, শিক্ষা ও নারী আন্দোলন। কমরেড হেনা দাস আমৃত্যু মহিলা পরিষদের সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালের ২০ জুলাই কমরেড হেনা দাস ৮৫ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান।